১৯৪ বছর বয়সী কচ্ছপ জোনাথনের জিনে মানুষের বার্ধক্য ঠেকানোর সূত্র!

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৯ পিএম

বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক স্থলচর প্রাণী হিসেবে পরিচিত জোনাথন নামের দৈত্যাকার কচ্ছপের জিন বিশ্লেষণ করে দীর্ঘায়ুর সম্ভাব্য রহস্য খুঁজে পেয়েছেন গবেষকেরা। প্রায় ১৯৪ বছর বয়সী এই কচ্ছপের জিনে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য শনাক্ত হয়েছে, যা কোষের ক্ষতি মেরামত ও প্রদাহ কমাতে সহায়তা করতে পারে। গবেষকদের আশা, এসব বৈশিষ্ট্য নিয়ে আরও গবেষণা ভবিষ্যতে মানুষের বার্ধক্যজনিত ক্ষয় ধীর করা এবং দীর্ঘায়ু বাড়ানোর চিকিৎসা উদ্ভাবনে কাজে আসতে পারে।

সেশেলস দ্বীপপুঞ্জের আদিবাসী আলদাবরা প্রজাতির এই কচ্ছপ জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের প্রত্যন্ত দ্বীপ সেন্ট হেলেনায়। তার সঠিক বয়স নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও ১৮৮২ সালের একটি ছবিতে তাকে পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় দেখা যায়। এ প্রজাতির কচ্ছপ সাধারণত প্রায় ৫০ বছর বয়সে পূর্ণবয়স্ক আকারে পৌঁছায়। সেই হিসাব থেকে জোনাথনের বর্তমান বয়স আনুমানিক ১৯৪ বছর বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তার বয়স ২০০ বছর বা তারও বেশি হতে পারে বলে মনে করেন গবেষকদের একজন।

বুধবার (০৭ অক্টোবর) বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স অ্যাডভান্সেস-এ প্রকাশিত গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জোনাথনের সম্পূর্ণ জিনগত উপাদান বা জিনোম এবং এপিজিনোম বিশ্লেষণ করেছেন। এপিজিনোম হলো জিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থা, যা নির্ধারণ করে কোন জিন কখন সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় থাকবে। বিশ্লেষণে কোষের ক্ষতি থেকে সুরক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত ২৮৭টি জিনগত বৈচিত্র্য শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ডিএনএ মেরামত এবং প্রদাহ কমানোর সঙ্গে যুক্ত কিছু জিন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

গবেষণার সহলেখক ও যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী জাস্টিন গারলাখের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে মানুষের কোষে জিনের কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হতে থাকে। এর ফলে কোষে ত্রুটি জমে এবং ক্যানসারের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিন্তু জোনাথনের ক্ষেত্রে বার্ধক্যেও জিনের কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে তরুণ প্রাণীর মতো নিয়ন্ত্রিত রয়েছে বলে বিশ্লেষণে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এই বৈশিষ্ট্য শুধু জোনাথনের মধ্যেই রয়েছে, নাকি দৈত্যাকার কচ্ছপের প্রজাতিগত বৈশিষ্ট্য, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

গবেষকেরা জোনাথনের জিনগত উপাদানের সঙ্গে সেশেলসের আলদাবরা প্রবালপ্রাচীরের তুলনামূলকভাবে কমবয়সী একই প্রজাতির কচ্ছপের জিনগত বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে দেখেছেন। এতে উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি কোষে শক্তি উৎপাদনকারী অঙ্গাণু মাইটোকন্ড্রিয়ার অবস্থাও জোনাথনের বয়সের তুলনায় আশ্চর্যজনকভাবে ভালো বলে দেখা গেছে। গবেষকদের মতে, দীর্ঘায়ুর সঙ্গে মাইটোকন্ড্রিয়ার সুস্থতার সম্পর্ক থাকতে পারে। ১১০ বছর বা তার বেশি বেঁচে থাকা মানুষের ক্ষেত্রেও কার্যকর মাইটোকন্ড্রিয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কালেল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা স্টিফেন ক্লার্ক বলেছেন, জোনাথনের জিনোম কোষকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখার প্রক্রিয়া বুঝতে সহায়তা করতে পারে। তাঁর দল মাইটোকন্ড্রিয়ার কার্যকারিতা বাড়াতে পারে, এমন ওষুধ নিয়ে গবেষণা করছে এবং আগামী এক-দুই বছরের মধ্যে সেগুলো মানুষের ওপর চিকিৎসা পরীক্ষায় নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, একটি মাত্র কচ্ছপের জিন বিশ্লেষণ করে দীর্ঘায়ুর কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তুরস্কের মধ্যপ্রাচ্য কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনোম গবেষক হান্দান মেলিকে দোনেরতাশের মতে, জোনাথনের মতো ব্যতিক্রমী প্রাণীর সঙ্গে অন্য দীর্ঘজীবী প্রাণী এবং শতবর্ষী মানুষের তুলনামূলক গবেষণা প্রয়োজন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বাফেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভিনসেন্ট জে. লিঞ্চ গবেষণায় ব্যবহৃত কিছু গণনাভিত্তিক পদ্ধতির সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এসব পদ্ধতিতে জিনগত পরিবর্তনকে উপকারী বা ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে ভুল হতে পারে।

প্রায় ১৮০ কেজি ওজনের জোনাথন চোখে ছানি পড়ার কারণে দৃষ্টিশক্তি হারালেও এখনো সক্রিয় রয়েছে। তার জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে আরও গবেষণা হলে দীর্ঘায়ু, বার্ধক্য ও ক্যানসার সম্পর্কে নতুন ধারণা পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। তবে এসব আবিষ্কার থেকে মানুষের আয়ু বাড়ানোর কার্যকর চিকিৎসা তৈরি করতে আরও গবেষণা ও পরীক্ষা প্রয়োজন। সূত্র: সিএনএন 

এএস
আরও পড়ুন