হাইড্রেশন ব্রেকে ফিফার জমজমাট বাণিজ্য

আপডেট : ১৪ জুন ২০২৬, ০৯:৩৮ পিএম

বিশ্বকাপ মানেই গোল, নাটকীয়তা, আবেগ আর নিরবচ্ছিন্ন উত্তেজনা। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে ফুটবলপ্রেমীদের চোখে নতুন এক দৃশ্য ধরা পড়ছে। ম্যাচ চলছে, এক দল আক্রমণের পর আক্রমণ চালাচ্ছে, গ্যালারিতে উত্তেজনা চরমে, ঠিক তখনই রেফারির বাঁশি। খেলা থেমে যাচ্ছে তিন মিনিটের জন্য। এবারের বিশ্বকাপে ফিফার নতুন বাধ্যতামূলক ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ নিয়ম এখন বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত বিষয়।

প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের বিশ্বকাপে প্রতিটি ম্যাচের প্রথমার্ধের ২২তম এবং দ্বিতীয়ার্ধের ৬৭তম মিনিটে তিন মিনিটের বিরতি রাখা হয়েছে। ফিফার ভাষ্য, খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্যই এই সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়ায় পানিশূন্যতা, ক্লান্তি এবং তাপজনিত শারীরিক ঝুঁকি কমাতে এই বিরতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আধুনিক ফুটবল আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুতগতির। খেলোয়াড়রা এখন প্রতি ম্যাচে আগের চেয়ে অনেক বেশি দৌড়ান, বেশি স্প্রিন্ট দেন এবং অধিক শারীরিক চাপের মধ্যে থাকেন। চিকিৎসকদের মতে, নির্দিষ্ট বিরতিতে শরীরে তরল সরবরাহ করা পারফরম্যান্স ধরে রাখার পাশাপাশি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিও কমাতে পারে।

কোচরাও এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন। ডাগআউট থেকে দ্রুত নির্দেশনা, কৌশল পরিবর্তন কিংবা ম্যাচের ছন্দ নতুন করে সাজিয়ে নেওয়ার সুযোগ মিলছে এই বিরতিতে।

তবে সবাই যে এই সিদ্ধান্তে খুশি, তা নয়। ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্যগুলোর একটি হলো এর প্রবাহমানতা। ক্রিকেট, বাস্কেটবল বা আমেরিকান ফুটবলের মতো ঘনঘন বিরতির সংস্কৃতি এখানে নেই। সেই কারণেই অনেক সাবেক খেলোয়াড়, বিশ্লেষক এবং সমর্থক মনে করেন, বাধ্যতামূলক এই বিরতি খেলার স্বাভাবিক ছন্দে হস্তক্ষেপ করছে।

একটি দল যখন প্রতিপক্ষকে চেপে ধরেছে কিংবা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়েছে, ঠিক তখন হঠাৎ বিরতি ম্যাচের গতিপথও বদলে দিতে পারে। দর্শকদের একাংশও মনে করছেন, এতে খেলার স্বাভাবিক উত্তেজনা কিছুটা হলেও কমে যাচ্ছে।

তবে বিতর্কের সবচেয়ে বড় জায়গা অন্যত্র। সমালোচকদের প্রশ্ন, এই সিদ্ধান্ত কি সত্যিই শুধু খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য? নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও বড় কোনো বাণিজ্যিক হিসাব?

বিশ্বকাপ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দর্শকপ্রিয় ক্রীড়া আসরগুলোর একটি। সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপন এবং ডিজিটাল কনটেন্ট থেকে প্রতি মিনিটেই কোটি কোটি ডলারের লেনদেন হয়। ফলে ম্যাচে অতিরিক্ত ছয় মিনিটের আনুষ্ঠানিক বিরতি সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন বিজ্ঞাপন উইন্ডো তৈরি করেছে।

অনেক ফুটবলবোদ্ধার মতে, খেলোয়াড়দের সুরক্ষার যুক্তি বাস্তব হলেও এই নিয়ম থেকে বিপুল আর্থিক সুবিধাও পাওয়া যাচ্ছে। আর সেই কারণেই স্বাস্থ্য ও বাণিজ্যের সীমারেখা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

ফুটবলের ইতিহাসে নতুন নিয়মের বিতর্ক নতুন নয়। ভিএআর, গোললাইন প্রযুক্তি কিংবা পাঁচ বদলির নিয়ম নিয়েও একসময় তর্ক-বিতর্ক হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সেগুলোর অনেকই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

হাইড্রেশন ব্রেকের ক্ষেত্রেও হয়তো একই ঘটনা ঘটতে পারে। আবার এটাও সম্ভব, ভবিষ্যতে এটি ফুটবলের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিকীকরণের আরেকটি প্রতীক হিসেবেই পরিচিত হয়ে থাকবে।

এ মুহূর্তে উত্তর স্পষ্ট নয়। তবে বিশ্বকাপের এই নতুন বাস্তবতা একটি প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে, ফুটবলের ভবিষ্যৎ কি কেবল মাঠের ২২ জন খেলোয়াড় নির্ধারণ করবে, নাকি সম্প্রচার, বিজ্ঞাপন এবং বাণিজ্যিক স্বার্থও সমানভাবে প্রভাব ফেলবে?

বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা হাইড্রেশন ব্রেক সেই প্রশ্নটিকেই আরও জোরালো করে তুলেছে। সূত্র: ইএসপিএন, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।

AS
আরও পড়ুন