এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পেছাতে জাতিসংঘে বাংলাদেশের আবেদন

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫৩ পিএম

বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ (এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে বাংলাদেশের নতুন সরকার। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতির জন্য এই অতিরিক্ত সময় চেয়েছে ঢাকা।

বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী স্বাক্ষরিত একটি চিঠি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে পাঠানো হয়েছে। নতুন এই প্রস্তাব কার্যকর হলে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণ ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে যেতে পারে।

জাতিসংঘকে দেওয়া চিঠিতে সরকার বেশ কিছু যৌক্তিক কারণ তুলে ধরেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

১. বৈশ্বিক সংকট: কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি।

২. অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি: ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান।

৩. বাণিজ্যিক ঝুঁকি: এলডিসি থেকে বের হওয়ার পরপরই ইউরোপীয় বাজারে ‘জিএসপি প্লাস’ সুবিধা হারানো এবং অন্যান্য উন্নত দেশে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা।

সরকারের মতে, বর্তমান অস্থিতিশীল সামষ্টিক অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে নির্ধারিত সময়ে (২০২৬ সালে) উত্তরণ ঘটলে রপ্তানি বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

আগামী ২৪ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি সিডিপির বৈঠকে বাংলাদেশের এই আবেদনটি পর্যালোচনা করা হবে। কমিটির সুপারিশের পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে।

এলডিসি থেকে বের হলে সবচেয়ে সমস্যায় পড়তে হবে রপ্তানি খাতকে। শুল্কমুক্ত বাণিজ্যসুবিধা উঠে যাবে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর নিয়মিত হারে শুল্ক বসবে। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বাড়তি শুল্কের কারণে রপ্তানি বছরে ৫৩৭ কোটি ডলার বা সাড়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকা কমতে পারে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ কোনো শুল্কসুবিধা পায় না। 

এলডিসি উত্তরণ হলেও ২০২৯ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নে জিএসপির আওতায় এই শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকবে। এই দুটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার। বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে ওষুধশিল্প। এলডিসি থেকে বের হলে ওষুধশিল্পের ওপর মেধাস্বত্ব বিধিবিধান আরও কড়াকড়ি হবে। এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশের ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোকে আবিষ্কারক প্রতিষ্ঠানকে মেধাস্বত্বের জন্য অর্থ দিতে হয় না। মেধাস্বত্বের (পেটেন্ট) ওপর অর্থ দেয়া হলে ওই ওষুধের দাম বেড়ে যেতে পারে। 

এ কারণে এলডিসির গরিব নাগরিকরা স্বল্পমূল্যে ওষুধ পাবে না। এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ এই সুবিধা বেশি পেয়েছে। বাংলাদেশ ওষুধশিল্প একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর কাছ থেকে সহজ শর্তের ঋণ পাওয়ার সুযোগ সীমিত হতে পারে। অবশ্য বাংলাদেশ এখন বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) বিভিন্ন ঋণদাতা সংস্থার কাছ থেকে সহজ ও কঠিন শর্তের ঋণ নেয়া শুরু করেছে। এ ছাড়া নগদ ও ভর্তুকি সহায়তার পাশাপাশি করছাড়ে আরও কড়াকড়ি আরোপ হবে। 

বাংলাদেশকেও কৃষি, শিল্প, রেমিট্যান্সসহ বিভিন্ন খাতে এসব সহায়তা দেয়া কঠিন হবে। এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে লাভও আছে। পুরোপুরি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিবেচিত হবে, যা হবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। অর্থনৈতিক সক্ষমতার কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বেশি সুদে অনেক বেশি ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে। বিদেশি বিনিয়োগও আকৃষ্ট হবে। অবশ্য বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ পরিবেশ বড় ভূমিকা পালন করে।

উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ এলডিসি তালিকাভুক্ত হয়। এলডিসিভুক্ত থাকার সুবাদে পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ নানা সুযোগ পেয়ে এসেছে বাংলাদেশ। ২০১৮ ও ২০২১ সালের মূল্যায়নে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সব শর্ত পূরণ করায় ২০২৪ সালেই বাংলাদেশের এলডিসি থেকে বের হওয়ার কথা ছিল। তবে করোনার কারণে সেই সময়সীমা একবার বাড়িয়ে ২০২৬ সাল করা হয়েছিল। এবার নতুন সরকার দেশের সামগ্রিক সক্ষমতা বিবেচনায় আরও তিন বছর সময় বাড়ানোর উদ্যোগ নিলো। এর আগে নেপাল, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ ও মালদ্বীপও বিভিন্ন সংকটের কারণে একই ধরনের সুবিধা পেয়েছিল।

FJ
আরও পড়ুন