সপ্তাশ্চার্য

চীনের মহাপ্রাচীর

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৫, ০২:৪০ পিএম

পাথর ও মাটি দিয়ে তৈরি চীনের মহাপ্রাচীর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্থাপত্য। এটি পৃথিবীর প্রাচীন সপ্তাশ্চর্যগুলোর মধ্যে একটি। বহিঃশত্রু আক্রমণ থেকে বাঁচতে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে চীন প্রায় ৫০০০ মাইলের দীর্ঘ এই প্রাচীরটি গড়ে তোলে। যা চীনের মহাপ্রাচীর (গ্রেট ওয়াল অব চায়না) নামে পরিচিত। এটি খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতক থেকে খ্রিস্টীয় ১৬০০ শতক পর্যন্ত চীনের উত্তর সীমান্ত রক্ষা করার জন্য তৈরি করা হয়। ২২১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শুরু হওয়া কাজ শেষ হতে সময় লেগেছিল প্রায় ১৫ বছর।

চৈনিক বা চাইনিজরা কিন সাম্রাজ্যের সময় এর নির্মাণ কাজ শুরু করেছিলেন। চীনের প্রথম সম্রাট কিন সি হুয়াং এটি প্রথম ব্যবহার করেন এবং শত্রুর হাত থেকে নিজের সম্রাজ্যকে রক্ষার জন্য দীর্ঘ করে নির্মাণ করেছিলেন। চীনের প্রাকৃতিক বাধাগুলো ছাড়া অন্য অঞ্চল পাহারা দেওয়ার কাজে এবং উত্তর চীনের উপজাতি সুইংনুর বিরুদ্ধে এটি প্রথম স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল। প্রকৌশলের এই আশ্চর্য নিদর্শন মহাপ্রাচীরের উচ্চতা প্রায় ৫ থেকে ৮ মিটার এবং দৈর্ঘ্য ৮৮৫১.৮ কিলোমিটার। চওড়ায় প্রায় ৯.৭৫ মিটার। কথিত আছে চিনের প্রাচীরের ওপর দিয়ে একসঙ্গে ১২ জোড়া ঘোড়া একসঙ্গে চলতে পারতো।

প্রশ্ন থাকতে এ রকম বিশাল আকৃতির প্রাচীর তৈরি করার প্রয়োজন হয়েছিল কেন? ইতিহাস হতে যানা যায় সে সময় মাঞ্চুরিয়া আর মঙ্গোলিয়ার যাযাবর দস্যুরা চিনের বিভিন্ন অংশে আক্রমণ করতো এবং বিভিন্ন ক্ষতিসাধন করতো ফলে দস্যুদের হাত থেকে চীনকে রক্ষা করার জন্য এই প্রাচীর তৈরি করা হয়েছিল। ২৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে চীন বিভিন্ন খণ্ড রাজ্যে বিভক্ত ছিল। এদের মধ্যে একজন রাজা যার নাম ছিল ষি হুয়াং-টি, তিনি অন্য রাজাদের সংঘবদ্ধ করে নিজে সম্রাট হন। চীনের উত্তরে গোবি মরুভূমির পূর্বে দুর্ধর্ষ মঙ্গোলিয়দের বাস, যাদের কাজই হলো লুটতরাজ করা। এদের হাত থেকে দেশকে বাঁচানোর জন্য সম্রাটের আদেশে চীনের প্রাচীর তৈরির কাজ আরম্ভ হয়।

তবে চীনের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াঙের অধীনে নির্মিত প্রাচীরটি সবচেয়ে বিখ্যাত। তবে বর্তমান প্রাচীরটি মিং রাজবংশের শাসনামলে নির্মিত হয়। প্রাচীরটি চীনের ১৫টি প্রদেশ, কেন্দ্রীয় সরকারের ৯৭টি প্রশাসনিক অঞ্চল এবং ৪০৪টি ছোট ছোট শহরের মধ্য দিয়ে ঘুরেছে। দীর্ঘ এই প্রাচীর ঘিরে পর্যটকদের উৎসাহের শেষ নেই। প্রতি ইঞ্চিতেই যেন বিস্ময়। এর মধ্যেও সবচেয়ে সুন্দর-আকর্ষণীয় ৬টি স্থান বিশ্বভ্রমণ পিপাসুদের তালিকায় শীর্ষস্থান করে নিয়েছে।

ইয়ংতাই টার্টল সিটি

গ্রেট ওয়াল কেবল একটি ইট ও পাথরের প্রাচীর নয়। পাশের উচু উচু পাহাড়ের চূড়া, দুর্গ দিয়ে সাজানো বিভিন্ন শহরসহ স্রোতের টানে বয়ে চলা নদীগুলোকেও এর অংশ হিসাবে গণনা করা হয়। ইয়োলো রিভার (হলুদ নদী) ডিফেন্স লাইনের অংশ হিসাবে মিং রাজবংশের (১৩৬৮-১৬৪৪) নির্মিত টার্টল সিটির কাজ ১৬০৮ সালে সম্পন্ন হয়েছিল। যেখানে প্রায় ২,০০০ মানুষ এবং ৫০০ অশ্বারোহী ইউনিট ছিল।

বর্তমানে এই দুর্গ শহরটি চীনের উত্তরের কেন্দ্রীয় গানসু প্রদেশের জিংতাই এর সিতান শহরে অবস্থিত। জিংতাই থেকে মাত্র ৩০ মিনিটের দূরত্বে। টার্টল সিটিতে অনেকগুলো আসল কচ্ছপ না থাকলেও এটি অনন্য আকৃতির কারণে তার এই ডাকনাম পেয়েছে। এর দক্ষিণ গেট শহরটির প্রবেশদ্বার। ডিম্বাকৃতি প্রাচীর হলো শহরটির দেয়াল। আর উত্তর গেটটি শেষ অংশ। বর্তমানে চীনের সবচেয়ে সংরক্ষিত এবং প্রাচীরযুক্ত শহরগুলোর মধ্যে এটি একটি।

মুতিয়ানু এবং জিয়ানকু

মুতিয়ানু এবং জিয়ানকু মহাপ্রাচীরটির দুটি সংলগ্ন অংশ। বেইজিংয়ের থেকে পাহাড়ের চূড়া বরাবর প্রায় ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রসারিত। ৯০ মিনিটেরও কম সময়ে এখানে যাওয়া যায়। ইতিহাস থেকে জানা যায় লাখ লাখ শ্রমিক এই অংশটুকু নির্মাণে প্রায় শতাব্দী ব্যয় করেছে। এর একবারে চূড়ায় দাড়ালে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি অনুভব করা যায়।

মুতিয়ানু ও জিয়ানকুও মিং রাজবংশে টিকে থাকার দুটি বড় অস্ত্র হিসাবে কাজ করেছে। এর যেকোনোটিতে আরোহণ করা ভ্রমণপিয়াসীদের জীবনের অন্যতম এক অভিজ্ঞতা দেয়। মুতিয়ান পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে প্রাচীরের সেরা অংশ। অসাধারণ সুন্দর এ অংশের একেবারে শীর্ষে যেতে পারেন দর্শনার্থীরা। জিয়ানকু অংশটুকু বন্য প্রাচীর নামেও পরিচিত। এখানে যেতে কোনো টিকিটের প্রয়োজন নেই। কারণ এটি এখনো বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়নি। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে ২০২০ সাল পর্যন্ত স্থানীয় সরকার এখানে হাইকিং নিষিদ্ধ করেছে।

বাতাইজি

বাতাইজি গ্রামটি মহাপ্রাচীরের মতিয়ানলিং শহরের ঠিক ভেতরে অবস্থিত। ১৮৭৬ সালে নির্মিত একটি গির্জার ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। একজন জার্মান ধর্মপ্রচারকের নির্দেশে নির্মিত হয়েছিল। ১৫০ বছরের ইতিহাসে বহুবার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বর্তমানে এটিকে মেরামত করা হয়েছে। গির্জার বেল টাওয়ারটিই একমাত্র অংশ, যা এখনো বিদ্যমান। সুন্দর একটি সকাল বা বিকেল কাটানোর জন্য বাতাইজি একটি অনন্য জায়গা। গ্রামটি দেখার জন্য একটি আদর্শ সময় হলো গ্রীষ্মের শেষের দিক। কারণ এ সময় প্রাচীর ও এর পাশের সবুজ পাহাড়ের মধ্যে এক বিস্ময়কর বৈসাদৃশ্য দেখা যায়।

লাওনিউওয়ান

লাওনিউওয়ানের আরেক নাম ওল্ড অক্স বেন্ড গ্রেট ওয়াল। স্থানীয়রা মনে করে, লাওনিউওয়ান এমন একটি গ্রাম যেখানে প্রাচীর এবং শক্তিশালী হলুদ নদী এক সঙ্গে হাত মেলায়। এটি ১৪৬৭ সালে নির্মিত হয়েছিল। যখন এই এলাকার গ্রেট ওয়ালের সবচেয়ে বিখ্যাত টাওয়ার ওয়াংহে (আক্ষরিক অর্থে নদী দেখার টাওয়ার) অবস্থিত। ১৫৪৪ সালে নির্মিত হয়েছিল। লাওনিউওয়ান গ্রামটি শানসি প্রদেশের শিনঝো শহরের পিয়াওইয়াং এলাকায় অবস্থিত। গ্রীষ্মের শেষের দিক বা শরতের শুরুতে এটি ভ্রমণ করার জন্য একটি উপযুক্ত সময়। গ্রেট ওয়াল বরাবর মাত্র কয়েকটি জায়গা রয়েছে যেখানে এটি নদীর সঙ্গে মিলিত হয়। তার মধ্যে লাওনিউওয়ান সবেচেয়ে আশ্চর্যজনক।

পরি টাওয়ার

সিমাতাই (যেখানে গ্রেটওয়াল নির্মাণ শুরু হয়েছিল) অংশের সবচেয়ে পরিচিত টাওয়ারগুলোর একটি হলো পরি টাওয়ার। কিন্তু এখানে প্রবেশ করা কঠিন বলে খুব বেশি পর্যটক এখানে আসেন না। এর পরিবর্তে ওয়াংজিং টাওয়ার (পরি টাওয়ার থেকে মাত্র কয়েকশ কিলোমিটার দূরে) থেকে পরি টাওয়ারের অবিশ্বাস্য সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করা যায়। মুতিয়ানু এবং জিয়ানকুর মতো প্রাচীরের এই অংশটি বছরের যে কোনো সময় অনাবিল সৌন্দর্য অবলোকনের নিশ্চয়তা দেয়।

দুশিকৌ

সম্রাট জিয়াজিংয়ের (১৫০৭-৬৭) শাসনামলে নির্মিত প্রাচীরের এই একক অংশটি কিছু জায়গায় সাত মিটার পর্যন্ত লম্বা পাথরের স্তূপ দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল। চীনের হুবেই প্রদেশের চিচেংয়ের দুশিকৌ শহরের রাস্তার ঠিক পাশে অবস্থিত। দুশিকৌর স্তূপ পাথরের দেওয়ালটি অনন্য একটি স্থান। কারণ বেইজিংয়ের কাছে গ্রেট ওয়ালের অন্য অংশগুলো ভাটাচালিত ইট ব্যবহার করে নির্মিত হয়েছিল। এটি সবচেয়ে সুন্দর থাকে গ্রীষ্মে বিশেষ করে জুলাই এবং আগস্টে। যখন আশপাশের গোলাকার পাহাড়গুলো ঘন সবুজ হয়ে যায়। এই সময়ের শীতল সন্ধ্যা আউটডোর, বারবিকিউ বা বনফায়ারের উপযুক্ত আবহাওয়া বিরাজ করে।

প্রাচীর তৈরি হয়েছিল চিহলি-পুরোনো নাম পোহাই উপসাগরের কূলে শানসীকুয়ান থেকে কানসু প্রদেশের চিয়াকুমান পর্যন্ত। সম্রাটের উদ্দেশ্য কি সিদ্ধ হয়েছিল? এই প্রশ্ন থেকেই যায়। অনেক জায়গা প্রায়ই ভেঙে পড়তো অথবা মঙ্গোল দস্যুরা ভেঙে ফেলে চীনের মূল ভূখণ্ডে লুটপাট করার জন্য ঢুকে পড়তো। বর্তমানে প্রাচীর ঐতিহ্য বলে রক্ষার ব্যবস্থা করা হলেও প্রাচীরের অনেক জায়গা এখনো কিছু কিছু ভাঙা রয়েছে।

হান, সুই, নরদান এবং জিং সাম্রাজ্যের সময়ের ইতিহাসেও যে কারণে তারা এটি তৈরি করেছিলেন ঠিক একই কারণে চীনের প্রাচীরের পরিবর্ধন, পরিবর্তন, সম্প্রসারণ, পুনঃনির্মাণের উল্লেখ আছে। বেইজিংয়ের উত্তরে এবং পর্যটন কেন্দ্রের কিছু অংশ সংরক্ষণ এমনকি পুনঃনির্মাণ করা হলেও দেয়ালের বেশ কিছু অংশ ধ্বংসের সম্মুখীন হয়। ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো গ্রাম্য খেলার মাঠ এবং বাড়ি ও রাস্তা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পাথরের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দেয়ালের কিছু অংশ নাশকতার জন্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেয়াল পুনঃনির্মাণের জন্য কিছু অংশ ধ্বংস করা হয়েছে। উন্নত পর্যটন এলাকার কাছে মেরামতকৃত অংশ পর্যটন পণ্যের বিক্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। দেয়ালটিতে নিয়মিত বিরতিতে পর্যবেক্ষণ চৌকি আছে, যা অস্ত্র সংরক্ষণ, সেনাবাহিনীর আবাসন এবং স্মোক সংকেত প্রদানে কাজে লাগতো। সেনাঘাঁটি এবং প্রশাসনিক কেন্দ্রসমূহ দীর্ঘ বিরতিতে অবস্থিত। গ্রেট ওয়ালের সীমানার মধ্যে সেনা ইউনিটগুলোর যোগাযোগ যেমন-দলকে শক্তিশালী করা এবং শত্রুদের আন্দোলন সম্পর্কে সাবধান থাকা ছিল উল্লেখযোগ্য। দেখার সুবিধার জন্য পাহাড়সহ অন্য উঁচুস্থানে সংকেত টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছিল। এটি শুরু হয়েছে সাংহাই পাস এবং শেষ হয়েছে লোপনুর নামক স্থানে।

আরও পড়ুন