যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ বন্ধে পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও মাঠের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল রূপ নিচ্ছে। ঘোষিত যুদ্ধবিরতির মাঝেই অনবরত হামলা-পাল্টা হামলা, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তীব্র সামরিক উত্তেজনা এবং দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে এই যুদ্ধ থামানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের কৌশল ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এর আগে গত সোমবার হরমুজ প্রণালির নিকটবর্তী এলাকায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও বেশ কিছু নৌযানকে লক্ষ্য করে বোমাবর্ষণ করে মার্কিন বাহিনী। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এই অভিযানকে সৈন্যদের সুরক্ষায় একটি ‘প্রতিরোধমূলক ও আত্মরক্ষামূলক’ পদক্ষেপ হিসেবে দাবি করা হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানি নৌযানগুলো ওই নৌপথে মাইন স্থাপনের চেষ্টা করছিল, যা আন্তর্জাতিক জলসীমায় বড় ধরনের উসকানি।
অন্যদিকে, মার্কিন এই আগ্রাসনের জবাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলে আমেরিকার একটি ড্রোন আকাশেই ধ্বংস করেছে এবং আরেকটি ড্রোনসহ একটি যুদ্ধবিমানকে ধাওয়া করে তাড়িয়ে দিয়েছে। তেহরান একে নিজেদের অধিকার জবাব হিসেবে দেখলেও, হোয়াইট হাউস বা মার্কিন প্রশাসন এই ঘটনাকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চাইছে না।
নমনীয় অবস্থানে ট্রাম্প প্রশাসন
ইরানের অনড় অবস্থানের বিপরীতে ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের ব্যাকুলতা দেখা যাচ্ছে। হামলার পরও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তারা ‘সংযম’ দেখাচ্ছে এবং যুদ্ধবিরতি বহাল রয়েছে। এমনকি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভারত সফরকালে এই হামলা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে যান এবং শান্তির আলোচনার ওপর জোর দেন।
এর আগেও মে মাসের শুরুতে ইরান যখন বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায় ও মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করে, তখনো মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন বিষয়টিকে ‘বড় ধরনের যুদ্ধ শুরুর জন্য যথেষ্ট নয়’ বলে হালকাভাবে প্রচার করে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ হরমুজ প্রণালির উত্তেজনাকে মূল যুদ্ধ থেকে আলাদা করার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষায়, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা ছিল কেবলই একটি ‘লাভ ট্যাপ’ বা মৃদু আঘাত।
হরমুজ প্রণালি ও ট্রাম্পের আলটিমেটাম
গত ৭ এপ্রিল যখন ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন, তখন তার মূল শর্ত ছিল ইরানকে অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ খুলে দিতে হবে। ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, ইরান হরমুজ প্রণালি তাৎক্ষণিক ও নিরাপদভাবে খুলে দিতে রাজি হলে দুই সপ্তাহের জন্য বোমাবর্ষণ স্থগিত করা হবে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো, সাত সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক নৌপথটি এখনো কার্যত অবরুদ্ধ। ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া ডেডলাইন ইরান পাত্তাই দেয়নি।
কূটনৈতিক কৌশলে পিছিয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্র?
বারবার সময়সীমা পার হওয়া এবং ইরানের উসকানিকে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে হালকা করে দেখানোর বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের দর-কষাকষির অবস্থানকে দুর্বল করে দিচ্ছে। সমালোচকদের মতে, ট্রাম্প যে যেকোনো মূল্যে এই যুদ্ধ শেষ করতে এবং একটি চুক্তি করতে মরিয়া, তা তেহরানের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে।
ইরান বুঝতে পারছে—যুদ্ধ শেষ করার তাড়া তাদের চেয়ে ট্রাম্পের অনেক বেশি। আর মার্কিন প্রশাসনের এই দুর্বলতাই ট্রাম্পের জন্য সম্মানজনকভাবে ইরান যুদ্ধ থামানোর পথ কঠিন করে তুলছে। সূত্র: সিএনএন
লড়াই থামবে না, সামনে আরও বড় আঘাত আসছে: নেতানিয়াহু