জেরুজালেমভিত্তিক সাংবাদিক ফাতেন এলওয়ানের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে তিন লাখেরও বেশি অনুসারী। ফিলিস্তিনের বিভিন্ন ঘটনা এবং ইসরায়েলি দখলদারিত্বের চিত্র নিয়মিত তুলে ধরতেন তিনি। কিন্তু এখন তাঁর পোস্টগুলোতে সাধারণত কয়েকশর বেশি ভিউ হয় না।
২০২৬ সালের এপ্রিলে একদিন পাহাড়ে হাঁটতে গিয়ে এলওয়ান জানতে পারেন, দুই মাস স্থগিত থাকার পর তাঁর অ্যাকাউন্টটি হঠাৎ পুনরায় সক্রিয় হয়েছে। তাঁর ধারণা, ফিলিস্তিনপন্থী কনটেন্ট প্রকাশের কারণেই অ্যাকাউন্টটি স্থগিত করা হয়েছিল। অ্যাকাউন্ট ফিরে পাওয়ার পর তাঁর প্রথম স্টোরিতে সমুদ্রের পাশ দিয়ে হাঁটার দৃশ্য ছিল, যা ৩০ হাজার ভিউ পায়। কিন্তু পরের স্টোরিগুলোর ভিউ এক ঘণ্টার মধ্যেই কয়েকশতে নেমে আসে।
এলওয়ান এমন বহু ফিলিস্তিনপন্থী অ্যাকাউন্টধারীর একজন, যারা মনে করেন মেটা তাদের অ্যাকাউন্টে ‘শ্যাডোব্যান’ প্রয়োগ করেছে। শ্যাডোব্যান হলো এমন একটি কৌশল, যেখানে কোনো অ্যাকাউন্টের কনটেন্টের দৃশ্যমানতা বা পৌঁছানোর পরিধি কমিয়ে দেওয়া হয়, অথচ ব্যবহারকারীকে সরাসরি তা জানানো হয় না।
এলওয়ান বলেন, অনেকে তাঁকে জানিয়েছেন—তাঁর নাম ‘ফাতেন এলওয়ান’ লিখে আলাদাভাবে খুঁজে না দেখলে তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তাঁর ভাষায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেন তাঁর অস্তিত্বই নেই।
২০২৩ সালের শেষ দিকে, গাজায় ইসরায়েলের হামলা শুরুর পরপরই প্রথমবার এলওয়ানের অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা হয়। যুদ্ধের সময় মোট আটবার তাঁর অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে তিনি মেটার প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করে প্ল্যাটফর্মে তাঁর কনটেন্টের দৃশ্যমানতা কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ জানান। তবে তাঁর দাবি, মেটার প্রতিনিধিরা বিষয়টি শুনলেও কার্যকর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি।
এলওয়ানের ভাষায়, মেটা যেন স্কুলের সেই প্রধান শিক্ষকের মতো আচরণ করছে, যিনি খারাপ ছাত্রকে শাস্তি দিয়ে চুপ করিয়ে দেন। তাঁর মতে, মেটা বিশ্বজুড়ে একই ভূমিকা পালন করছে।
এলওয়ানের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। ফিলিস্তিনিদের কণ্ঠ কীভাবে মেটার প্ল্যাটফর্মে গত পাঁচ বছরে সীমিত বা দমন করা হয়েছে, তা নিয়ে একটি প্রতিবেদনে বহু ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে গাজায় ইসরায়েলি হামলার সময়ও এসব ঘটনা ঘটেছে।
‘দ্য প্ল্যাটফর্মসাইড অব প্যালেস্টাইন ২০২১–২০২৫’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে আরব সেন্টার ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সোশ্যাল মিডিয়া—৭ামলেহ। উট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি একাডেমিক গবেষণা দলের সহযোগিতায় তৈরি প্রতিবেদনে ৭ামলেহর নিজস্ব পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে ব্যবহারকারীদের মাধ্যমে নথিভুক্ত তিন হাজার ৫০০টির বেশি যাচাইকৃত ডিজিটাল অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে ‘প্ল্যাটফর্মহত্যা’ বা ‘প্ল্যাটফর্মসাইড’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে ফিলিস্তিনিদের ডিজিটাল উপস্থিতি, দৃশ্যমানতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অংশগ্রহণকে কাঠামোগত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মুছে দেওয়ার পরিস্থিতি বোঝাতে।
উট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ফ্যাবিও ক্রিস্তিয়ানো বলেন, গবেষণার ফলাফলকে নিছক ভুল বা বিচ্ছিন্ন ত্রুটি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, এটি এমন একটি কাঠামোগত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়া, যা শুধু কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে অতিরিক্ত বিস্তৃত নীতির প্রয়োগ, অসম মাত্রার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, হঠাৎ নীতিমালা পরিবর্তন, অ্যালগরিদমিকভাবে কনটেন্টের বিস্তার কমিয়ে দেওয়া, কনটেন্ট পুনর্বহালে বিলম্ব এবং ব্যবহারকারীদের সঙ্গে স্বচ্ছ যোগাযোগের অভাব রয়েছে।
ক্রিস্তিয়ানোর ব্যাখ্যায়, ‘প্ল্যাটফর্মহত্যা’ শুধু কোনো কনটেন্ট মুছে ফেলার বিষয় নয়; বরং একটি জনগোষ্ঠীকে অনলাইনে নিজেদের অস্তিত্ব প্রকাশ ও দাবি করার জন্য প্রয়োজনীয় ডিজিটাল অবকাঠামো থেকে বঞ্চিত করার বিষয়।
প্রতিবেদনটি সরাসরি দাবি করেনি যে মেটা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহারকারীদের সেন্সর করছে। তবে এতে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনপন্থী অ্যাকাউন্টগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা ও বন্ধ করে দেওয়ার যে ধারাবাহিক প্রবণতা দেখা গেছে, তা কেবল ভুলের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না। গবেষকদের সংজ্ঞা অনুযায়ী, এই কাঠামোগত প্রবণতাই ‘প্ল্যাটফর্মহত্যা’র বৈশিষ্ট্য বহন করে।
২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর মাত্র ৩২ দশমিক ৫ শতাংশের সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা লঙ্ঘনের কারণ শনাক্ত করা গেছে। অর্থাৎ অধিকাংশ ফিলিস্তিনি ব্যবহারকারী, যাদের কনটেন্ট মুছে দেওয়া, সীমিত করা বা দৃশ্যমানতা কমানো হয়েছে, তারা এর কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাননি।
গবেষক, অধিকারকর্মী ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সহিংস বা সন্ত্রাসী সংগঠনের প্রচার ঠেকানোর জন্য তৈরি এই নীতি গাজায় ইসরায়েলি যুদ্ধ নিয়ে প্রতিবেদন করা গণমাধ্যম, এনজিও, সাংবাদিক, অধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞদের কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হয়েছে।
ফিলিস্তিনপন্থী অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা, কনটেন্ট মুছে দেওয়া এবং সরাসরি সম্প্রচারের সুযোগ সীমিত করার ঘটনা গাজায় কর্মরত সাংবাদিকদের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে। কারণ, বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেক সাংবাদিকের প্রধান মাধ্যমই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। গাজা থেকে যুদ্ধের খবর ও বাস্তব পরিস্থিতির ছবি বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছাতেও এসব প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এলওয়ান জানান, তিন বছর আগে তাঁকে ইনস্টাগ্রামে টানা ৩৬০ দিনের জন্য লাইভ করার সুযোগ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই নিষেধাজ্ঞা বারবার বাড়ানো হয়েছে। মেটার কমিউনিটি গাইডলাইন ভঙ্গের কথা বলা হলেও ঠিক কোন নিয়ম তিনি ভেঙেছেন, তা তাঁকে স্পষ্ট করে জানানো হয়নি। তাঁর তৈরি বিকল্প অ্যাকাউন্টগুলোও খোলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, মাঠে থাকা সাংবাদিকদের পুরোপুরি নীরব করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আগে তাঁর মাধ্যমে বিভিন্ন কণ্ঠকে তুলে ধরত বা নির্দিষ্ট বিষয়ে সমালোচনা করত। এখন তাঁর কনটেন্ট কারও কাছে পৌঁছায় না বলে দাবি করেন তিনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর মধ্যে অ্যাকাউন্ট স্থগিত করাই ছিল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ব্যবস্থা। এরপর ছিল লাইভসহ বিভিন্ন ফিচার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা এবং কনটেন্ট মুছে ফেলা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর—যেদিন হামাসের ইসরায়েল আক্রমণ এবং গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হয়—শ্যাডোব্যানের ঘটনা প্রায় শূন্য থেকে বেড়ে মোট শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ৩ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছায়।
ফিলিস্তিনি মিডিয়া সেন্টার ই’লামের সাংবাদিকতা শিক্ষক ও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ মাইসুন জুবি জানান, প্রকাশ্য নিষেধাজ্ঞা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কারণে এমন এক ধরনের ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা এখনো নিষেধাজ্ঞার শিকার না হওয়া সাংবাদিকদেরও আত্মনিয়ন্ত্রণে বাধ্য করছে।
যুদ্ধের সময় তাঁর দল এমন ঘটনা, ছবি বা প্রতিবেদন প্রকাশ করা থেকে বিরত থেকেছে, যেগুলো নিয়ে অভিযোগ আসতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করেছিল। তাঁর মতে, শুধু মেটার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাই নয়, সমন্বিতভাবে ব্যবহারকারীদের রিপোর্ট করাও সাংবাদিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
গাজাভিত্তিক কুদস নিউজ নেটওয়ার্কের প্রধান সম্পাদক ইউসেফ আবু ওয়াতফা বলেন, ২০১৫ সাল থেকেই মেটা তাদের কনটেন্ট নিয়মিত সীমিত করে আসছে। গাজা যুদ্ধ শুরুর পর সেই পদক্ষেপ আরও কঠোর হয়েছে।
যুদ্ধের সময় তাদের ফেসবুক পেজটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর আগে দুবার সেটি বন্ধ করার চেষ্টা হয়েছিল বলে জানান তিনি। বর্তমানে ফেসবুকে আরবি বা ইংরেজি—কোনো ভাষাতেই তাদের কনটেন্ট অবশিষ্ট নেই। ইনস্টাগ্রামে শুধু আরবি ভাষার অ্যাকাউন্টটি টিকে আছে; ইংরেজি ভাষার অ্যাকাউন্টটি দুই প্ল্যাটফর্ম থেকেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এ কারণে তারা এক্স, টেলিগ্রাম ও কিছুটা হোয়াটসঅ্যাপের মতো বিকল্প প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকেছেন। তবে সেখানেও বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে জানান আবু ওয়াতফা।
তাঁর মতে, এসব পদক্ষেপ ফিলিস্তিনি বয়ানের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে। গাজার ছবি বিশ্বে পৌঁছালেও সেখানে ঘটে যাওয়া বাস্তবতার হয়তো ২০ থেকে ৩০ শতাংশের বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেনি।
অভিযোগের জবাবে মেটার একজন মুখপাত্র ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন নিয়ে ২০২২ সালে প্রকাশিত স্বাধীন পর্যালোচনা প্রতিবেদন এবং ২০২২–২০২৪ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদনে বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত তথ্যের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তারা এমন একটি ব্যবস্থা চালু করেছে, যার মাধ্যমে রিপোর্ট করা কনটেন্ট সংশ্লিষ্ট আরবি উপভাষা বোঝেন—এমন মডারেটরদের কাছে পাঠানো হয়। পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক ও রাজনৈতিক বক্তব্যের সুযোগ বাড়াতে DOI নীতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবহারকারীদের পক্ষ থেকে করা অভিযোগের নিষ্পত্তি নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। পাঁচ বছরে ৭ামলেহ মেটার কাছে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবহারকারীদের পক্ষে ২ হাজার ৮২৮টি আপিল জমা দিয়েছিল। এর প্রায় অর্ধেকের ক্ষেত্রে মেটার কাছ থেকে দীর্ঘ সময় কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
৭ামলেহর অ্যাডভোকেসি ম্যানেজার লামা নাজিহ বলেন, স্বাধীন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যেসব অংশীদার মেটার কাছ থেকে কার্যকর সাড়া পান, তাঁদের অনেকেরই প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ব্যক্তিগত যোগাযোগ রয়েছে। আনুষ্ঠানিক চ্যানেল ব্যবহার করলেই যে সমানভাবে সাড়া পাওয়া যায়, তা নয়।
তিনি প্রশ্ন রাখেন—মেটার সঙ্গে অংশীদারত্বের মূল্যায়নের একমাত্র মানদণ্ড হওয়া উচিত, সেটি ফিলিস্তিনি ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা দিচ্ছে কি না; নাকি শুধু মেটার সুনাম রক্ষা করছে।
সূত্র: আল জাজিরা
মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্তে নিহত ২ সেনা
'প্রতিবেশী দেশে হামলার জন্য ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ নেই'
জিম্বাবুয়ের কারিবা হ্রদে ফেরি উল্টে নিহত ৪৪
চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি আর নেই