সুশৃঙ্খল লংমার্চে সরকারকে ১১ দলের কড়া বার্তা

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১৮ পিএম

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চে ব্যাপক জনসাড়া পাওয়া গেছে। শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জোটের নেতারা তাদের ঘোষিত ছয় দফা দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। দাবিগুলো পূরণ না হলে আন্দোলনের পরিধি আরও বাড়ানোর ঘোষণাও এসেছে।

শনিবার সকাল ৭টায় রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ। নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর, কুমিল্লার পদুয়ার বাজার, ফেনীর মহিপাল ও চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে নির্ধারিত পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। এর বাইরে আরও কয়েকটি অনির্ধারিত পথসভায় অংশ নেন নেতাকর্মীরা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে রাত ৯টার দিকে চট্টগ্রামের লালদীঘিতে পৌঁছায় লংমার্চের বহর। সেখানে সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ হয়।

১১ দলের ঘোষিত ছয় দফার মধ্যে রয়েছে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সারের সংকট দূর করা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং দলীয়করণ বন্ধ করা।

নেতারা জানিয়েছেন, এসব দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে আরও তিনটি লংমার্চ করা হবে। এরপর আগামী ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ করে বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। তাদের হুঁশিয়ারি, ছয় দফা বাস্তবায়ন করা না হলে এই ছয় দফাই এক দফার আন্দোলনে রূপ নিতে পারে।

লংমার্চের পুরো পথজুড়ে ছিল মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি। শাপলা চত্বর থেকে লালদীঘি পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করতে দেখা যায় বিপুলসংখ্যক মানুষকে। তাদের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা, বিভিন্ন দলের পতাকা ও প্রতীক, লা-ইলাহা পতাকা এবং ছয় দফার দাবিসংবলিত ব্যানার-ফেস্টুন। অনেকেই ফুল ছুড়ে লংমার্চের গাড়িবহরকে স্বাগত জানান। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং জনগণের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগানও দেন তারা।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে লংমার্চে গাড়ির সংখ্যা এক হাজারে সীমিত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সংখ্যা ধরে রাখা যায়নি। বিশেষ অনুরোধের পর শেষ মুহূর্তে আরও ২০০টি গাড়ির জন্য স্টিকার অনুমোদন দেওয়া হয়। এর বাইরেও বিপুলসংখ্যক গাড়ি বহরে যুক্ত হওয়ায় নির্ধারিত সংখ্যার প্রায় তিন গুণ গাড়ি অংশ নেয়। ফলে কোনো কোনো এলাকায় লংমার্চের বহরকে একটি স্থান অতিক্রম করতেই আধা ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে।

তবে এত বড় বহর এবং বিপুল মানুষের উপস্থিতির মধ্যেও কর্মসূচিতে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া যায়নি। বরং পুরো পথেই শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়টি ছিল চোখে পড়ার মতো।

লংমার্চে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের খাবারের ব্যবস্থাপনাতেও ছিল ভিন্ন চিত্র। সকালের নাস্তা নিজেদের উদ্যোগে করার কথা থাকলেও অধিকাংশ গাড়ির দায়িত্বশীলরা আগে থেকেই খাবারের ব্যবস্থা করেন। কোথাও পাউরুটি-কলা, কোথাও পরোটা-ডালভাজি দেওয়া হয়। আবার কোনো কোনো নেতা বাড়ি থেকে রুটি, গরুর মাংস ও ডালভাজি নিয়ে এসে সহযাত্রীদের খাওয়ান।

কুমিল্লা শহরে পৌঁছানোর আগেই নির্ধারিত একটি স্থানে বহর থামিয়ে গাড়িতে থাকা মানুষের সংখ্যা অনুযায়ী দুপুরের খাবারের প্যাকেট পৌঁছে দেওয়া হয়। সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশের আগেও একইভাবে প্রতিটি গাড়ির জন্য রাতের খাবার সরবরাহ করা হয়। খাবার না পাওয়ার বিষয়ে কোনো অভিযোগ বা এ নিয়ে বিশৃঙ্খলার ঘটনাও ঘটেনি বলে আয়োজকেরা জানান।

শাপলা চত্বর ও লালদীঘির সমাবেশসহ পাঁচটি নির্ধারিত এবং দুটি অনির্ধারিত পথসভায় ১১ দলের শীর্ষ নেতারা ছয় দফার পক্ষে বক্তব্য দেন। একই সঙ্গে তারা সরকারকে সতর্ক করে বলেন, দ্রুত দাবিগুলো বাস্তবায়ন করা না হলে আন্দোলন আরও কঠোর রূপ নিতে পারে।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বিভিন্ন পথসভায় নিজেই নানা স্লোগানে অংশ নেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকেও স্লোগান দিতে দেখা যায়।

জামায়াত আমির শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে এবং প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পূরণ করছে না। জনগণ এ আচরণ ক্ষমা করবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথে থাকবেন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি তুলে তিনি বলেন, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের দাবিও পূরণ হয়নি। সেই দাবি আদায়েই তারা আবার রাজপথে নেমেছেন। একই সঙ্গে ঘরে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও আলো নিশ্চিত করার দাবিও জানান তিনি।

পথসভাগুলোতে সাধারণ মানুষের উদ্দেশে বিভিন্ন প্রশ্ন তুলে শফিকুর রহমান জানতে চান, দেশের মানুষ ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ও গ্যাস পাচ্ছে কি না, চাঁদাবাজি বন্ধ হয়েছে কি না, মাদকের বিস্তার ঠেকানো গেছে কি না এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, মানুষের জন্য তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হলে সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ তুলে নাহিদ ইসলাম অবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি জানান এবং অন্যথায় সরকারকে কঠিন পরিণতির মুখে পড়তে হবে বলে সতর্ক করেন।

এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে ‘বিদ্যুৎ দে, গ্যাস দে, নইলে গদি ছেড়ে দে’ স্লোগানের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, যে স্লোগান তিনি দিয়েছেন, এখন তাকে এবং তার দলকে সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে।

খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন এবং বাংলাদেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে সামনে আরও কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি রাখতে হবে। তিনি বলেন, এই লংমার্চের মধ্য দিয়ে চলমান আন্দোলনের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হলো।

১১ দলের নেতাদের এসব বক্তব্যকে সরকারের প্রতি নতুন করে দেওয়া সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন অভিজ্ঞ মহল।

১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, লংমার্চে প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি মানুষের সাড়া পাওয়া গেছে। তার আশা, এই কর্মসূচি থেকে সরকার একটি নতুন বার্তা পেয়েছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করলে এর পরিণতি কী হতে পারে, সরকার তা বুঝতে পারবে। আর তা না হলে পরবর্তী পরিস্থিতি কী হবে, সেটিই ভবিষ্যৎ বলে দেবে।

এমসিএইচ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত