যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি হুমকি, জাতিসংঘে আসলে কী হয়েছিলো?

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৮ এএম

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু হলেও তা স্বস্তির বদলে তৈরি করেছে নতুন অনিশ্চয়তা। একদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে নিউইয়র্কে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন ও তেহরান একে অপরকে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। ফলে যুদ্ধ অবসানের সম্ভাব্য কূটনৈতিক পথটি একই সঙ্গে সামরিক উত্তেজনার চাপের মধ্যেও এগোচ্ছে।

২৩ সেপ্টেম্বর ইরান সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে তার জবাব আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হবে। একই সময়ে ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যুদ্ধ বন্ধ, অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে তেহরানের কয়েকটি শর্ত রয়েছে।

এর আগের দিন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেছিলেন, শান্তি চুক্তি না হলে তিনি ইসলামিক রিপাবলিককে ‘অ্যানিহিলেট’ বা ধ্বংস করে দিতে পারেন। একই ভাষণে তিনি অবশ্য একটি চুক্তির সম্ভাবনাও উন্মুক্ত রেখেছিলেন।

নতুন কূটনৈতিক তৎপরতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও নৌপথটি যুদ্ধের কারণে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এর নিরাপদ ও স্বাভাবিক চলাচল পুনঃস্থাপন আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ইরানের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে তেহরানের নির্ধারিত শর্ত মেনে নিতে হবে। এরপরই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই বলেছেন, আগের ধরনের কূটনৈতিক কাঠামোয় ইরান আর ফিরবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সাতটি শর্ত পূরণ করতে হবে এবং এরপরই হরমুজ খোলা ও আলোচনা নিয়ে অগ্রগতি সম্ভব।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ, মার্কিন সামরিক অভিযান থামানো, নৌ অবরোধ ও অর্থনৈতিক যুদ্ধের অবসান এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করা।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির মধ্যে যোগাযোগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

মার্কিন পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা আলোচনা করেন। উইটকফ পরে জানান, মধ্যস্থতাকারীরা দুই পক্ষের মধ্যে যাতায়াত করে দীর্ঘ আলোচনা চালিয়েছেন এবং আলোচনার একটি পর্ব শেষ হয়েছে।

তবে ইরানের বক্তব্যে বিষয়টিকে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। তেহরান বলেছে, কাতারের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে এবং মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের শর্তগুলো ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আলোচনার অস্তিত্ব নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে অস্বীকার নেই, কিন্তু সেটি সরাসরি বৈঠক নাকি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ—তা নিয়ে বয়ানে পার্থক্য রয়েছে।

নিউইয়র্কের যোগাযোগ ইরানের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, মার্কিন পক্ষের অনুরোধে আরাগচি উইটকফের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে ইরানের শর্ত তুলে ধরেন।

কিন্তু ইরানের কট্টরপন্থী ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস-ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম এই ব্যাখ্যার সমালোচনা করেছে। তাসনিম নিউজ আরাগচির ব্যাখ্যাকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করে প্রশ্ন তুলেছে—মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যদি ইরানের শর্ত আগেই জানানো হয়ে থাকে, তাহলে সরাসরি বৈঠকের প্রয়োজন কেন হলো?

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজাইও আরাগচির কাছে জানতে চেয়েছেন, তিনি কী ধরনের অনুমোদন নিয়ে এ যোগাযোগ করেছেন।

অন্যদিকে পার্লামেন্ট সদস্য মোজতবা জারেই আরাগচির পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছেন, তাঁর পর্যালোচনা অনুযায়ী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ যোগাযোগের অনুমোদন ছিল। তিনি একই সঙ্গে দাবি করেছেন, কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি; বরং ইরানের সাতটি শর্ত মার্কিন প্রতিনিধির কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, কূটনৈতিক উদ্যোগটি শুধু ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার মতপার্থক্যের মধ্যেই আটকে নেই; ইরানের অভ্যন্তরেও আলোচনার ধরন ও সীমা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের জাতিসংঘের ভাষণেও এই দ্বৈত অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে।

পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, ট্রাম্পের বক্তব্য শোনার পর তিনি নিজের প্রস্তুত করা ভাষণ পরিবর্তন করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ তোলেন এবং যুদ্ধে ইরানের প্রতিরোধের কথা তুলে ধরেন।

তবে একই সঙ্গে তিনি শান্তির জন্য আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেননি। তাঁর বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—ইরান আলোচনায় যেতে পারে, কিন্তু চাপ বা জবরদস্তির ভাষার ভিত্তিতে নয়।

এটি ইরানের বর্তমান কূটনৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তেহরান একদিকে সামরিক প্রতিরোধের সক্ষমতা প্রদর্শন করছে, অন্যদিকে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আলোচনার সম্ভাবনাও ধরে রাখছে। ওয়াশিংটনের অবস্থানও পুরোপুরি একমাত্রিক নয়।

জাতিসংঘে ট্রাম্প ইরানকে কঠোর ভাষায় সতর্ক করলেও একই সময়ে তিনি একটি চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন। নিউইয়র্কে আরব দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পরও তিনি ইরানের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনার কথা বলেছেন।

তবে ২৩ সেপ্টেম্বর তিনি ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক হুমকিও দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান কোলাং ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় কার্যক্রম চালালে যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে হামলা চালাতে পারে।

অন্যদিকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ ও খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার জানায়, নতুন হামলা হলে ইরান আরও শক্তিশালী ও অনির্দেশ্য পাল্টা আঘাতের জন্য প্রস্তুত।

ফলে দুই পক্ষের বক্তব্যে একই সঙ্গে দুটি ধারা দেখা যাচ্ছে—আলোচনার দরজা খোলা রাখা এবং সামরিক বিকল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—দুই পক্ষের শর্তগুলো কি এমন কোনো জায়গায় এসে মিলতে পারে, যেখানে যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার একটি স্থায়ী কাঠামো তৈরি হবে?

ইরান চাইছে যুদ্ধ বন্ধ, সামরিক চাপ ও নৌ অবরোধের অবসান এবং জব্দ সম্পদ মুক্ত করার মতো বিষয়গুলোকে আলোচনার ভিত্তি করতে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা নিয়ে নিরাপত্তাগত নিশ্চয়তা চায়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হরমুজ প্রণালির প্রশ্ন। তেহরান এটিকে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করছে। ওয়াশিংটনের জন্য আবার হরমুজের অবাধ চলাচল শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

আরেকটি সমস্যা হলো—কে ইরানের হয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। নিউইয়র্কে আরাগচির যোগাযোগ নিয়ে তেহরানের ভেতরে যে বিতর্ক দেখা দিয়েছে, তা দেখাচ্ছে যে আলোচনার কূটনৈতিক অংশের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনুমোদনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিকে সরলভাবে ‘শান্তির আলোচনা’ কিংবা ‘নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতি’—কোনো একটিতে সীমাবদ্ধ করা কঠিন। বরং ওয়াশিংটন ও তেহরান একই সময়ে দুটি পথ অনুসরণ করছে।

একদিকে নিউইয়র্কে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ হচ্ছে, ইরানের শর্ত নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এবং মার্কিন প্রশাসনও সম্ভাব্য সমঝোতার কথা বলছে। অন্যদিকে দুই দেশের নেতারা প্রকাশ্যে সামরিক হুমকি দিচ্ছেন এবং নতুন হামলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না।

এ অবস্থায় কূটনীতির সাফল্য নির্ভর করবে শুধু আলোচনার টেবিলে কী বলা হচ্ছে তার ওপর নয়; বরং দুই পক্ষ কতটা সামরিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সামলাতে পারে এবং হরমুজসহ যুদ্ধ-সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে বাস্তবসম্মত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে—তার ওপর।

অর্থাৎ, নিউইয়র্কে আলোচনার দরজা খুলেছে ঠিকই, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে শান্তির পথে হাঁটার আগে ওয়াশিংটন ও তেহরানকে এখনো অনেক কঠিন রাজনৈতিক ও সামরিক বাধা অতিক্রম করতে হবে।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন