হোয়াইট হাউসে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার ফেরানোর নির্দেশ

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২২ পিএম

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নিষিদ্ধ করা তিনটি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার অবিলম্বে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন একটি ফেডারেল আদালত। নিষেধাজ্ঞাটি সাংবিধানিকভাবে টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা কম এবং সাংবাদিকদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া বা ‘due process’ দেওয়া হয়নি এমন পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) এই নির্দেশ দেন মার্কিন জেলা বিচারক টিমোথি কেলি।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা সংবাদমাধ্যম তিনটি হলো CNN, MS NOW এবং Politico। ১৮ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প প্রশাসন এসব প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণে প্রবেশাধিকার বাতিল করেছিল। এর পর তিন সংবাদমাধ্যম আদালতে মামলা করে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আবেদন জানায়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিচারক কেলি প্রশাসনকে তিন সংবাদমাধ্যমের প্রেস পাস অবিলম্বে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে আগামী ১৪ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন তিনি।

বিচারকের পর্যবেক্ষণে, বর্তমান নথিপত্রে প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত যুক্তির পক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার বাতিল করলে জাতীয় নিরাপত্তা কীভাবে সুরক্ষিত হবে, তার যথেষ্ট বাস্তব ভিত্তি আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এর আগে বুধবার শুনানিতে বিচারক কেলি সাংবাদিকদের স্থায়ী প্রেস পাস বাতিলের আগে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো এবং নিজেদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি আগের কয়েকটি আদালতের রায়ের নজিরও তুলে ধরেন।

কেন নিষিদ্ধ করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন
১৮ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প ঘোষণা করেন- CNN, MS NOW ও Politico-কে হোয়াইট হাউস থেকে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। ট্রাম্প এসব সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে তার প্রশাসন সম্পর্কে নেতিবাচক ও ভুল সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ তুলেছিলেন। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞাটি কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রতিবেদনের কারণে নয়; বরং এসব প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সংবাদ কাভারেজের সামগ্রিক ধরন নিয়ে তার আপত্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, তিন সংবাদমাধ্যম আদালতে দাবি করে, তাদের সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার বাতিল করা হয়েছে প্রেসিডেন্টের অপছন্দের সংবাদ প্রকাশের প্রতিক্রিয়া হিসেবে। তাদের অভিযোগ, এ ধরনের ব্যবস্থা মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর অধীনে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং পঞ্চম সংশোধনীর অধীনে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অধিকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি প্রশাসনের
আদালতে ট্রাম্প প্রশাসনের আইনজীবীরা অবশ্য ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়, হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার একটি সুবিধা বা privilege, সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত অধিকার নয়। প্রশাসনের আইনজীবীরা আরও যুক্তি দেন, কিছু প্রতিবেদনে জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ এবং সংবেদনশীল বা শ্রেণিবদ্ধ তথ্য ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়কে প্রশাসন সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করার যৌক্তিকতার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করে।

তবে বিচারক কেলির সর্বশেষ আদেশে জাতীয় নিরাপত্তার এই যুক্তির পক্ষে পর্যাপ্ত বাস্তব প্রমাণ আদালতের সামনে নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবারের আদেশটি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নয়। বরং মামলা চলাকালে CNN, MS NOW ও Politico-এর সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার পুনর্বহাল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে পরবর্তী পর্যায়ে আদালতকে মূল মামলায় নিষেধাজ্ঞার বৈধতা নিয়ে আরও বিস্তারিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রশাসনও এই আদেশের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে।

এই মামলার ফলাফল হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে কোনো প্রেসিডেন্ট বা প্রশাসন সংবাদমাধ্যমের সংবাদ কাভারেজের সঙ্গে সরকারি প্রবেশাধিকারকে কতটা যুক্ত করতে পারবে, সেই প্রশ্নটি সামনে এসেছে।

নিরাপত্তা নাকি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা?
মামলাটিতে দুটি সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক স্বার্থের সংঘাত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে সরকার জাতীয় নিরাপত্তা, সংবেদনশীল তথ্য এবং সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আনছে। অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে কোনো নির্দিষ্ট সংবাদমাধ্যমকে তার সংবাদ কাভারেজের কারণে শাস্তি দেওয়া হলে তা স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

আদালতের সর্বশেষ আদেশে অবশ্য এই মুহূর্তে কোনো চূড়ান্ত সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি। বিচারক মূলত বলেছেন, নিষেধাজ্ঞার পক্ষে প্রশাসনের উপস্থাপিত জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত যুক্তির সঙ্গে বর্তমান রেকর্ডের যথেষ্ট সামঞ্জস্য নেই এবং সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার বাতিলের আগে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। ফলে CNN, MS NOW ও Politico-এর সাংবাদিকরা আপাতত হোয়াইট হাউসে তাদের পূর্ববর্তী প্রবেশাধিকার ফিরে পাচ্ছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকারের সাংবিধানিক সীমা নিয়ে আইনি লড়াইটি আরও এগিয়ে যাবে।

জেএম
আরও পড়ুন