দুই পরাশক্তির মাঝখানে ইরাক, ইরানের সঙ্গে বিমান চলাচল বন্ধ

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০৭ এএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের মধ্যে দুই পরাশক্তির চাপে ক্রমেই কঠিন অবস্থায় পড়ছে ইরাক। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার হুমকির মুখে দেশটি ইরানি এয়ারলাইনগুলোর জন্য বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড সার্ভিস বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে ইরাক ও ইরানের মধ্যে নিয়মিত বিমান চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

আল-জাজিরার বাগদাদ প্রতিনিধি জ্যাক হিউসনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই দেশের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা ইরাক এমন এক অবস্থায় পড়েছে, যেখানে এক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে অন্য পক্ষের চাপ সামলাতে হচ্ছে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ইরানি বিমান সংস্থাগুলোর ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার অংশ হিসেবে ইরাকের বিমানবন্দরগুলোতে তাদের প্রয়োজনীয় সেবা বন্ধ করা হয়েছে। ২৫ সেপ্টেম্বর রয়টার্স জানায়, বাগদাদ ও নাজাফের পর এরবিল ও সুলাইমানিয়াও ইরানি ফ্লাইট স্থগিত করেছে। ফলে ইরানের সঙ্গে চলাচলকারী ইরাকি চার বিমানবন্দর থেকেই ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেছে।

ইরানি বিমান সংস্থাগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগে থেকেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সতর্ক করেছিলেন, ইরানি বিমানকে জ্বালানি, অবতরণ সুবিধা, গ্রাউন্ড সার্ভিস কিংবা টিকিট বিক্রির মতো সেবা দিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানও মার্কিন ‘সেকেন্ডারি স্যাংশনের’ আওতায় পড়তে পারে।

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি বিদেশি বিমানবন্দর বা আকাশসীমা বন্ধ করার ক্ষমতা না রাখলেও স্থানীয় সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি তৈরি করে ইরানি বিমান চলাচলকে কার্যত বাধাগ্রস্ত করা সম্ভব হয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় ইরানের সঙ্গে বিমান যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ইরানি বিমানগুলোর জন্য বিভিন্ন দেশে জ্বালানি ও গ্রাউন্ড সার্ভিস বন্ধের প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়।

ইরানের জন্য ইরাক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও যোগাযোগের পথ। দুই দেশের মধ্যে রয়েছে গভীর বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক। বিশেষ করে ইরাকের বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইরানি গ্যাসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ইরাকের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হলে তার অর্থনৈতিক প্রভাব তেহরানের ওপরও পড়তে পারে।

অন্যদিকে, ইরাকের রাজনীতিতে ইরানঘনিষ্ঠ শিয়া রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীগুলোর শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা মেনে ইরানি বিমান চলাচল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি করতে পারে।

আল-জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরাকের কিছু ইরানপন্থী রাজনীতিক মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কাছে নতি স্বীকার না করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ইরানি এয়ারলাইনগুলোর সেবা বন্ধ করেছে।

শুধু বিমান যোগাযোগ নয়, চলমান যুদ্ধের কারণে ইরাকের সামগ্রিক অর্থনীতিও চাপে পড়েছে।

ইরাকের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে তেল রপ্তানিনির্ভর। দেশটির তেল রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ ও হরমুজে জাহাজ চলাচলে বাধার কারণে ইরাকের তেল পরিবহন ও রপ্তানিতেও বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে।

ফলে একদিকে বিমান যোগাযোগ সংকুচিত হচ্ছে, অন্যদিকে সমুদ্রপথে তেল রপ্তানিও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এর সঙ্গে যুদ্ধের কারণে বাণিজ্য, সরবরাহব্যবস্থা ও আঞ্চলিক যোগাযোগে তৈরি হওয়া সমস্যাও যুক্ত হয়েছে।

এর আগে রয়টার্স জানিয়েছে, হরমুজ নিয়ে চলমান সংকটের মধ্যে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে একটি প্রস্তাব দিয়েছে। ওয়াশিংটন সামরিক চাপ কমিয়ে ইরানের বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার করলে এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরান প্রস্তুত বলে একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

ইরাকের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু বিমান চলাচল বন্ধ হওয়ার ঘটনা নয়; এটি দেশটির পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক নির্ভরতার জটিল বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরাকের নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে রয়েছে দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্য, জ্বালানি নির্ভরতা এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ।

ফলে ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করলে তেহরানের অসন্তোষের ঝুঁকি থাকে। আবার ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখলে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

ইরাকের ভেতরেও এই পরিস্থিতি নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। কেউ মনে করেন, ইরানের অতিরিক্ত প্রভাব ইরাকের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে সীমিত করছে। অন্যদিকে ইরানঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকেই বর্তমান যুদ্ধ ও আঞ্চলিক অস্থিরতার জন্য দায়ী করে।

তবে বাস্তবতা হলো—যুদ্ধের সরাসরি পক্ষ না হয়েও এর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ বহন করতে হচ্ছে ইরাককে।

ইরানি বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া সেই চাপের সর্বশেষ উদাহরণ। হরমুজে জাহাজ চলাচল, তেল রপ্তানি, ইরানি গ্যাস সরবরাহ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা—সবকিছুর প্রভাব একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে বাগদাদকে।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন