ইরানে পঞ্চম গণঅভ্যুত্থান ‘কখন হবে, সেটাই প্রশ্ন’: সাবেক মার্কিন উপদেষ্টা

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪১ এএম

ইরানে নতুন করে বড় ধরনের গণঅভ্যুত্থান ঘটবে কি না, তা নয়; বরং কখন ঘটবে সেটিই এখন প্রশ্ন বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও হাডসন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো লুডোভিক হুড।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা মাইক পেন্সের অধীনে কাজ করা হুডের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ, নৌ অবরোধ এবং ইরানের রাজস্ব কমে যাওয়ার কারণে তেহরানের ওপর চাপ বাড়ছে। এর ফলে সরকার নিরাপত্তা বাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় কর্মীদের বেতন ঠিকমতো দিতে পারবে কি না-সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। তাঁর ভাষায়, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর গত ৪৭ বছরের মধ্যে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র এখন ‘সবচেয়ে নাজুক অবস্থার’ মধ্যে রয়েছে।

ইরানবিষয়ক ‘Eye for Iran’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হুড বলেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে দেশটিতে পঞ্চম বড় গণঅভ্যুত্থানের সম্ভাবনাকে তিনি ‘কখন, সেটিই প্রশ্ন, হবে কি না, তা নয়’ হিসেবে দেখছেন। তবে তিনি একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছেন, এর অর্থ এই নয় যে তিনি ঠিক কখন বা কীভাবে এমন ঘটনা ঘটবে, তার পূর্বাভাস দিচ্ছেন।

হুডের বিশ্লেষণের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, তেল রাজস্বের ওপর চাপ এবং নৌ অবরোধ তেহরানের আর্থিক সক্ষমতাকে দুর্বল করছে।

হাডসন ইনস্টিটিউটে প্রকাশিত তাঁর সাম্প্রতিক লেখাতেও হুড যুক্তরাষ্ট্রের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির মাধ্যমে ইরানের তেল ও অন্যান্য রাজস্বের উৎস সংকুচিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর দাবি, অর্থনৈতিক চাপের প্রভাব শুধু সাধারণ মানুষের ওপর নয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর ওপরও পড়তে পারে।

বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত বেতন দেওয়া সম্ভব না হলে তাদের আনুগত্য ও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে এমন যুক্তি দিয়েছেন তিনি।

ইরানে অতীতেও একাধিক বড় বিক্ষোভ হয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং সামাজিক নানা ইস্যুতে দেশটির বিভিন্ন শহরে আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু এসব আন্দোলনের পরও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মূল নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কাঠামো টিকে রয়েছে।

রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস, বাসিজসহ নিরাপত্তা কাঠামো এখনো রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করে রেখেছে। অতীতের বিক্ষোভগুলো বড় আকার ধারণ করলেও শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরে বড় ধরনের ভাঙন না হলে সরকার টিকে যাওয়ার সক্ষমতা রয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

মার্চে Washington Post-এর প্রকাশিত একটি মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নেও বলা হয়েছিল, বড় ধরনের মার্কিন সামরিক অভিযান হলেও ইরানের প্রতিষ্ঠিত সামরিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বকে উৎখাত করা সহজ নাও হতে পারে।

হুডের যুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কোনো গণআন্দোলন সফল হবে কি না, তা শুধু রাস্তায় কত মানুষ নামল তার ওপর নির্ভর করে না। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো কতটা ঐক্যবদ্ধ থাকে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর মতে, অর্থনৈতিক চাপ যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বেতন দেওয়া নিয়েও সরকারকে সমস্যায় পড়তে হয়, তাহলে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণক্ষমতায় চাপ তৈরি হতে পারে।

তবে এই ধারণা এখনো একটি বিশ্লেষণ ও সম্ভাব্য পরিস্থিতির মূল্যায়ন, কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়।

হুডের মন্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগও চলছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে দুই পক্ষের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা হয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালি, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে দুই দেশের অবস্থানে এখনও বড় পার্থক্য রয়েছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান সম্প্রতি বলেছেন, তেহরান NPT-এর কাঠামোর মধ্যে পরমাণু কর্মসূচিতে সীমা নির্ধারণ নিয়ে আলোচনায় প্রস্তুত। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘অবিশ্বাসের পরিবেশ’-এর কথাও উল্লেখ করেছেন।

অর্থাৎ একদিকে আলোচনা চালানোর সম্ভাবনা রয়েছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপও অব্যাহত রয়েছে।

হুড মনে করেন, ইরানে বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে অভ্যন্তরীণ চাপ আরও বাড়তে পারে। তাঁর মতে, সামরিক ক্ষয়ক্ষতি, কমে যাওয়া রাজস্ব, নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ সব মিলিয়ে তেহরানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

তবে ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো নেই। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্যেও দেশটির নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।

ফলে হুডের ‘কখন, সেটিই প্রশ্ন’ মন্তব্যটি মূলত ইরানের বর্তমান দুর্বলতা সম্পর্কে তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ। বাস্তবে নতুন কোনো গণঅভ্যুত্থান কতটা বিস্তৃত হবে, নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিক্রিয়া কী হবে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভেতরে কোনো বিভাজন তৈরি হবে কি না এসব বিষয়ের ওপরই পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে।

এএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত