সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর ছড়িয়ে পড়া ধ্বংসাবশেষে একটি কিন্ডারগার্টেন ও চিকিৎসাকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃহস্পতিবারের (৮ অক্টোবর) এ ঘটনার মধ্যেই ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা রিয়াদের বিমানবন্দরসহ সৌদি আরবের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে। হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনায় রাজধানীজুড়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে, ব্যাহত হয়েছে বিমান চলাচলও।
সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর এর ধ্বংসাবশেষ পড়ে কিন্ডারগার্টেন ও একটি চিকিৎসাকেন্দ্রের ভবনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়েছেন কি না, তা জানায়নি কর্তৃপক্ষ।
এদিকে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা সৌদিয়ার একটি উড়োজাহাজের গায়ে ফাটল ও ছিদ্র দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন দুই প্রত্যক্ষদর্শী। বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত এক সূত্রের দাবি, বিমানবন্দরে তিনটি উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার দাবি
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বৃহস্পতিবার রিয়াদ বিমানবন্দর লক্ষ্য করে তিনটি হামলার কথা জানান। তাঁর দাবি, সৌদি আরবের নাজরান বিমানবন্দর এবং খামিস মুশাইত এলাকার একটি বিমানঘাঁটিও ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু ছিল।
অন্যদিকে, ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থনকারী সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, রিয়াদের দিকে ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। জোটের দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগেই ধ্বংস করা হয়।
তবে হুতিদের দাবি অনুযায়ী বিমানবন্দরে হামলা কতটা সফল হয়েছে, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষও বিমানবন্দরে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করেনি।
তেল স্থাপনা ছাড়ার হুঁশিয়ারি
সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলো থেকে কর্মীদের সরে যাওয়ার সতর্কবার্তা দেয় হুতিরা। এর কয়েক দিন আগে রাজধানীর দক্ষিণে একটি বড় তেল শোধনাগারে হামলার ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতিদের মধ্যে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, আকাশসীমা ও বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
কূটনীতিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ
বৃহস্পতিবার সকালে রিয়াদে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর কূটনীতিকদের নিজ নিজ দূতাবাসের ভেতরে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে এএফপিকে জানিয়েছেন কয়েকজন কূটনীতিক।
আগের কিছু হামলার সময় বাসিন্দাদের মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠানো হলেও এবার তেমন কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শহরের কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিদ্যালয়ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়। অন্তত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তার জন্য বেসমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। রিয়াদের কিং আবদুল্লাহ ফিন্যান্সিয়াল ডিস্ট্রিক্টে কর্মরত কয়েকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু প্রতিষ্ঠান কর্মীদের এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়।
এক অভিভাবক এএফপিকে বলেন, তাঁর মেয়ে ফোন করে আতঙ্কিত অবস্থার কথা জানিয়েছিল।
এদিকে সৌদি আরবে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে কর্মরত মার্কিন সরকারি কর্মকর্তাদের রিয়াদ বিমানবন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিশেষ অনুমোদনের প্রয়োজন হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বিমান চলাচলে বিঘ্ন
রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বেশ কয়েকটি ফ্লাইট দেরিতে ছেড়েছে বা বাতিল হয়েছে বলে যাত্রীদের জন্য প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতির বিস্তারিত ব্যাখ্যা না দিয়ে যাত্রীদের ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছে।
এর আগে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে হামলার ঘটনায় হতাহতের খবর জানিয়েছিল দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। বুধবারের তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদ বিমানবন্দরে এক সুদানি নাগরিক এবং আভা বিমানবন্দরে একজন মিসরীয় ও একজন আলজেরীয় নাগরিক নিহত হয়েছিলেন।
ইয়েমেনে সংঘাত ও মানবিক সংকট
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরব ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে সামরিক জোটের নেতৃত্বে হস্তক্ষেপ করে। ২০১৪ সাল থেকে দেশটির রাজধানী সানা ও বেশ কয়েকটি বড় জনবসতিপূর্ণ এলাকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে হুতিরা।
চার বছরের বিরতির পর গত জুলাইয়ে সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়ে ওঠে। গত মাসে হুতিরা দ্রুত অভিযান চালিয়ে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের পুরো অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করে। অন্যদিকে, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী সৌদি সমর্থনে পাল্টা অভিযান চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় এলাকা ও মোখা বন্দরনগরী পুনর্দখলের দাবি জানিয়েছে।
তবে হুতিরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকা হারানোর দাবি অস্বীকার করেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে সাংবাদিকদের প্রবেশ সীমিত এবং পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে বলে উভয় পক্ষের দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।
এদিকে ইয়েমেনে জুলাই থেকে নতুন করে সংঘাতের কারণে দুই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে জাতিসংঘের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে এএফপি। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ দেশটিতে গভীর মানবিক সংকট তৈরি করেছে; জনসংখ্যার বড় অংশই খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
সৌদি আরবের রাজধানী ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার দাবি এবং পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ঘটনা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের জন্যও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সূত্র: এএফপি, আল জাজিরা।
তুর্কমেনিস্তান কেন গেলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট
আফগানিস্তানের বিপক্ষে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ
ইমেইল মিসে চীনের হাতে যেভাবে পৌঁছালো মার্কিন যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশ