পারমাণবিক বোমা নিয়ে জারিফের বক্তব্যে ইরানে তীব্র বিতর্ক

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৭ পিএম

ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফের একটি পুরোনো বক্তব্য নতুন করে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বক্তব্যটিতে তিনি বলেছিলেন, পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করলেই কোনো দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। কিন্তু ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরবর্তী সামরিক সংঘাতের পর তার সেই অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করছেন ইরানের কট্টরপন্থীরা। তাদের যুক্তি, পারমাণবিক অস্ত্র না থাকায় ইরান কার্যকর প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতে পারেনি।

প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ভিডিওতে জারিফের বক্তব্যটি ২০২৫ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে অথবা মে মাসে দেওয়া হয়েছিল। সে সময় তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন- বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য বদলে গেছে এবং পারমাণবিক অস্ত্র থাকলেই সামরিক হামলা ঠেকানো যায় না। ইসরায়েলের অভিজ্ঞতা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের উদাহরণ টেনে তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেন, পারমাণবিক অস্ত্র কোনো রাষ্ট্রের ওপর হামলা প্রতিরোধ কিংবা তার টিকে থাকা নিশ্চিত করার চূড়ান্ত নিশ্চয়তা নয়।

পারমাণবিক বোমা তৈরির ধারণাকে তিনি ‘কয়েকজন অজ্ঞ উসকানিদাতার প্রচারিত চিন্তাধারা’ বলে অভিহিত করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের প্রেক্ষাপটে তার বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য নতুন করে সামনে এসেছে। এখন প্রশ্ন উঠছে যে পারমাণবিক অস্ত্র না থাকায় কি ইরান সামরিক হামলার ঝুঁকিতে পড়েছে, না-কি পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশটির নিরাপত্তার বিকল্প পথগুলোকে দুর্বল করে দিতে পারে?

পারমাণবিক নীতি পরিবর্তনের দাবি
ইরানের রাজনীতি ও সংবাদমাধ্যমের একাংশে দেশটির পারমাণবিক নীতি পরিবর্তনের দাবি জোরালো হচ্ছে। দেশটির সংসদ সদস্য হাসান গাশগাভি সাম্প্রতিক সময়ে দাবি করেছেন, পারমাণবিক নীতি পরিবর্তনের পক্ষে জনসাধারণ, বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের মধ্যে সমর্থন বাড়ছে। রক্ষণশীল সংবাদপত্র ভাতান-এ এমরোজ সোমবার (১২ অক্টোবর) প্রথম পাতায় ‘ইরানের বোমা তৈরি করা উচিত’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ হামলা প্রতিরোধে ইরানের একটি ‘প্রতিরোধমূলক’ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়।

ইরানের সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির সদস্য আহমদ বাখশায়েশ আরদেস্তানিও খাবার অনলাইনকে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হুমকি পারমাণবিক বোমা তৈরির পক্ষে দেশটির অভ্যন্তরীণ যুক্তিকে শক্তিশালী করতে পারে। অন্যদিকে, জারিফের বক্তব্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন সাংবাদিক সাইয়েদ সাদেক হোসেইনি। তার যুক্তি, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা এবং দেশটির পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের হত্যার ঘটনা দেখিয়েছে যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পারমাণবিক উপাদান মজুত করলেই হামলা ঠেকানো বা যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য করা যায় না। তবে এসব বক্তব্য ইরানের অভ্যন্তরীণ বিতর্কের বিভিন্ন অবস্থান তুলে ধরে; পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করলে দেশটি ভবিষ্যৎ হামলা ঠেকাতে পারবে কি-না, তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে না।

জারিফের বিরুদ্ধে কট্টরপন্থীদের আক্রমণ
পুরোনো ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর ইরানের কয়েকটি স্থানে সরকারপন্থী ও যুদ্ধপন্থী সমাবেশে জারিফের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসফাহান ও বোরুজের্দের সমাবেশে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সমালোচনা করা হয়। ইসফাহানে বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ জারিফকে ‘গুপ্তচর’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভাড়াটে’ বলে আখ্যা দেন। তবে এগুলো বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ; এর পক্ষে প্রতিবেদনে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

রক্ষণশীল সংবাদপত্র কেইহানও জারিফের সমালোচনা করে ‘জনাব জারিফ! আমেরিকা বিপদে পড়লেই কেন আত্মঘাতী পদক্ষেপ নেন?’ শিরোনামে নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। পত্রিকাটির অভিযোগ, সংবেদনশীল সময়ে জারিফের বক্তব্য ইরানের জাতীয় নিরাপত্তাকে দুর্বল করে এবং প্রতিপক্ষকে সুবিধা দেয়। ২০১৫ সালে ইরান ও বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে সম্পাদিত পারমাণবিক চুক্তি নিয়েও জারিফের সমালোচনা করেছে পত্রিকাটি। তাদের অভিযোগ, ওই আলোচনায় জারিফ প্রতিপক্ষকে দায়মুক্ত করার চেষ্টা করেছেন। এসব সমালোচনা মূলত ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধের অংশ।

নিরাপত্তা, না-কি কূটনীতি; ইরানের সামনে কোন পথ?
জারিফের বক্তব্য শুধু পারমাণবিক অস্ত্রের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ইরানের পররাষ্ট্রনীতিতে নিরাপত্তা ও সামরিক বিবেচনার প্রাধান্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। তার মতে, প্রতিবেশী দেশগুলোকে ইরান কীভাবে দেখে, তার ওপর নির্ভর করে দেশটির কূটনৈতিক সম্পর্কের ধরন। প্রতিবেশীদের সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখলে নিরাপত্তা ও সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো পররাষ্ট্রনীতিতে প্রাধান্য পায়। আর তাদের অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে দেখলে কূটনীতিক ও ব্যবসায়ীদের ভূমিকা বাড়ে।

জারিফের বক্তব্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, আফগানিস্তান, সিরিয়া ও ইরাকে ইরানের রাষ্ট্রদূতদের কেন সামরিক নিরাপত্তাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করতে হবে। তার যুক্তি ছিল, প্রতিবেশীদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি তেহরান, কারণ দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিবেচনা অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করেছে। অন্যদিকে, জারিফের সমালোচকদের বক্তব্য হলো, সামরিক সংঘাতের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে- প্রতিপক্ষকে হামলা থেকে বিরত রাখতে আরও শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা প্রয়োজন। তাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রশ্নটি শুধু অস্ত্রের নয়, বরং সম্ভাব্য আক্রমণকারীর হিসাব বদলে দেওয়ার কৌশলগত উপায়।

বোমা কি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে?
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে পারমাণবিক অস্ত্রকে সম্ভাব্য আক্রমণকারীর জন্য বড় ঝুঁকি তৈরির একটি প্রতিরোধক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করে অস্ত্রের সক্ষমতা, প্রতিপক্ষের হিসাব, পাল্টা আঘাতের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সংঘাতের পরিস্থিতির ওপর। পারমাণবিক অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও কোনো দেশ সীমিত সামরিক হামলা, গোপন অভিযান, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা প্রচলিত অস্ত্রের আক্রমণ থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে না।

একইভাবে, পারমাণবিক অস্ত্র না থাকাই কোনো দেশের ওপর হামলার একমাত্র কারণ, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা, সামরিক সক্ষমতা এবং কূটনৈতিক হিসাবও সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণ করে। জারিফের বক্তব্যের সময় তিনি পরবর্তী সংঘাতের পূর্ণ চিত্র জানতেন না। এখন সেই অভিজ্ঞতার আলোকে তার সমালোচকেরা পারমাণবিক প্রতিরোধের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন, আর তার সমর্থকেরা বলছেন, সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরতা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না। ইরানের সামনে তাই বিতর্কটি শুধু বোমা তৈরি করা বা না করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কৌশল, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং কূটনীতির ভূমিকা।

জেএম
আরও পড়ুন