ইরানকে ‘প্রকৃত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিরোধের শেষ দুর্গ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ফিলিস্তিনি-আমেরিকান লেখক ও অধিকারকর্মী সুসান আবুলহাওয়া। একই সঙ্গে ইরানকে নিয়ে দ্য গার্ডিয়ান-এ প্রকাশিত একটি খোলা চিঠির সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, সামরিক হামলার মুখে থাকা ইরানের সঙ্গে তার বিরোধীদের একই পাল্লায় মাপা ঠিক নয়।
প্রেস টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আবুলহাওয়া বলেন, ওই চিঠিতে ইরানের রাজনৈতিক বন্দী, ইসরায়েলের কারাগারে আটক ফিলিস্তিনি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আটকব্যবস্থাকে একই ‘কারাবন্দি রাষ্ট্র’ কাঠামোর মধ্যে দেখানো হয়েছে। তাঁর মতে, এতে তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক, আইনি ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার মধ্যে ভুল তুলনা তৈরি হয়েছে।
আবুলহাওয়ার আপত্তির মূল জায়গা হলো, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনাকে দেশটির ওপর চলমান মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা থেকে আলাদা করে দেখা। তাঁর দাবি, ইরান কয়েক দশক ধরে একতরফা নিষেধাজ্ঞা, ‘শাসন পরিবর্তনের’ প্রচেষ্টা, গোপন অভিযান ও হত্যাকাণ্ডসহ পশ্চিমা ও ইসরায়েলি হস্তক্ষেপের মুখে রয়েছে।
ইরানের রাজনৈতিক বন্দীদের ‘কাঁচির দুই ধারার মাঝখানে’ আটকে থাকা মানুষের সঙ্গে তুলনা করার বিষয়টিও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। আবুলহাওয়ার মতে, এ ধরনের তুলনা ইরান এবং দেশটির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শক্তিগুলোর মধ্যে সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার বড় পার্থক্যকে আড়াল করে।
তিনি বলেন, একদিকে রয়েছে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি দেশ, অন্যদিকে রয়েছে বিপুল অর্থ, অস্ত্র, সরবরাহব্যবস্থা, নজরদারি সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রভাবসম্পন্ন শক্তি। তাই দুই পক্ষকে সমান অবস্থানে দেখানো বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করেন তিনি।
আবুলহাওয়া ওই চিঠিতে ইরানের ওপর হামলার মাত্রাকেও যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগ করেন। তিনি ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও অবকাঠামোগত স্থাপনায় হামলা, ইরানি বিজ্ঞানী ও সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ড এবং ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের বিভিন্ন অভিযান ও হামলার কথা তুলে ধরেন।
তিনি ১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গুলিতে ইরান এয়ারের একটি বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করেন। ওই ঘটনায় ২৯০ যাত্রী ও ক্রু নিহত হয়েছিলেন। পাশাপাশি সাইবার হামলা ও নৌযানে নাশকতার মতো ঘটনাকেও ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের চাপের অংশ হিসেবে দেখান তিনি।
ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আটকব্যবস্থাকে একই কাঠামোয় দেখানোরও বিরোধিতা করেন আবুলহাওয়া। তাঁর মতে, ইরানের কারাগারে আটক ব্যক্তিরা মূলত দেশটির নাগরিক এবং রাষ্ট্রের নিজস্ব আইন অনুযায়ী তাদের বিচার করা হয়। অন্যদিকে ইসরায়েলের হাতে আটক ফিলিস্তিনিরা দখলদারত্বের অধীনে থাকা জনগোষ্ঠীর সদস্য, আর যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আটক আইনি কাঠামো ভিন্ন।
তাঁর ভাষায়, এগুলো তিনটি আলাদা সম্পর্ক, একটি রাষ্ট্র ও তার নাগরিকদের সম্পর্ক, একটি রাষ্ট্র ও সীমান্ত অতিক্রমকারী অভিবাসীদের সম্পর্ক এবং একটি দখলদার শক্তি ও দখল করা জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক। তাই এগুলোকে এক শব্দে ‘কারাবন্দি রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখালে প্রকৃত পার্থক্যগুলো হারিয়ে যায়।
ইরানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিচয় ও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগও ওই চিঠিতে স্পষ্ট করা হয়নি বলে মন্তব্য করেন আবুলহাওয়া। তাঁর দাবি, এর ফলে ইরানি কর্তৃপক্ষ যেসব ক্ষেত্রে নিরাপত্তা হুমকি, বিদেশি হস্তক্ষেপ, সন্ত্রাসবাদ ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগের কথা বলে, সেসব বিষয় আলোচনার বাইরে থেকে যায়।
চিঠিতে ব্যবহৃত ‘ফাঁপা সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা’ শব্দবন্ধ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আবুলহাওয়া। তাঁর মতে, পশ্চিমা চাপের মুখে ইরানের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা রক্ষার অবস্থানকে এভাবে বর্ণনা করা যথাযথ নয়।
তিনি বলেন, ইরান চাইলে পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে সমঝোতার পথ বেছে নিতে পারত। কিন্তু দেশটি সেই পথ না নিয়ে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। তাঁর মতে, ইরানের এই অবস্থানকে অনেকভাবেই ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, তবে একে ‘ফাঁপা’ বলা যায় না।
আবুলহাওয়ার ভাষায়, ইরানকে তার প্রতিরোধের জন্য কারও কাছে ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তাঁর দাবি, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানই প্রকৃত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিরোধের শেষ দুর্গ এবং বিশ্বজুড়ে অনেকেই দেশটির পক্ষে রয়েছে।
'সর্বশক্তি দিয়ে সশস্ত্র বাহিনীর পাশে আছে ইরান সরকার'
ভূমধ্যসাগরে অভিবাসীদের উদ্ধারে বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি
'মেক আমেরিকা হাংরি এগেইন', ট্রাম্পের স্লোগানকে গালিবাফের ব্যাঙ্গ
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধের ঘোষণা সামরিক যুদ্ধে পরাজয়ের শামিল