যে দুর্ঘটনা বদলে দেয় মাসুদ পেজেশকিয়ানের পুরো জীবন

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৩৮ পিএম

ইরানের রাজনীতিতে মাসুদ পেজেশকিয়ানের উত্থান অনেকটাই ব্যতিক্রমী। তিনি দীর্ঘদিনের কোনো রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকারী নন, ছিলেন না পেশাদার রাজনীতিকও। হৃদরোগের জটিল অস্ত্রোপচার করতেন যে চিকিৎসক, তিনিই শেষ পর্যন্ত ইরানের রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বোচ্চ পদে পৌঁছেছেন। কিন্তু তাঁর জীবনকে শুধু একজন চিকিৎসক থেকে প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠার গল্প হিসেবে দেখলে অনেকটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

তাঁর জীবনের পেছনে আছে জাতিগত বৈচিত্র্যের অভিজ্ঞতা, যুদ্ধের স্মৃতি, চিকিৎসক হিসেবে মানুষের কষ্ট কাছ থেকে দেখা, স্ত্রী ও সন্তান হারানোর ভয়াবহ ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি এবং একক পিতা হিসেবে তিন সন্তানকে বড় করে তোলার দীর্ঘ সংগ্রাম। ধর্মীয় অনুশীলন, সরল জীবনযাপন এবং নিজের আজেরি-কুর্দি শিকড়ের প্রতি সচেতন পরিচয়ও তাঁর ব্যক্তিত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আজেরি বাবা, কুর্দি মা দুই সংস্কৃতির ভেতর বেড়ে ওঠা

মাসুদ পেজেশকিয়ান ১৯৫৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ইরানের পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশের মাহাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন আজেরি এবং মা কুর্দি বংশোদ্ভূত। ফলে শৈশব থেকেই তিনি ইরানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জাতিগত ও সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হন। জীবনীসূত্রগুলোও তাঁর আজেরি ও কুর্দি পারিবারিক শিকড়ের কথা উল্লেখ করে।

এই পরিচয় পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক ভাবনাতেও প্রভাব ফেলেছে। পেজেশকিয়ান নিজেকে আজেরি বা তুর্কি পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি কুর্দি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয় ও অধিকার নিয়েও কথা বলেছেন। ফারসির পাশাপাশি তিনি আজেরি, কুর্দি, আরবি ও ইংরেজি ভাষায় যোগাযোগ করতে পারেন বলে বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।

ইরানের মতো বহু জাতিগোষ্ঠীর দেশে এই বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক পরিচয় তাঁর জনপরিচয়ের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।

সামরিক জীবনই খুলে দেয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের দরজা

পেজেশকিয়ানের পেশাগত জীবনের মোড় ঘুরে যায় সামরিক সেবার সময়। ১৯৭৩ সালে বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁকে ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জাবোলে পাঠানো হয়। সেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন ও স্বাস্থ্যসংকট কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা তাঁকে চিকিৎসাশাস্ত্রের দিকে আকৃষ্ট করে। জীবনীসূত্রে এই সময়টিকেই তাঁর চিকিৎসক হওয়ার সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

এরপর তাবরিজ ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেসে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধেও তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তৈরি হয়। তিনি একই সঙ্গে সামরিক চিকিৎসক এবং যুদ্ধক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাঁর সামনে মানুষের জীবন, মৃত্যু ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের কঠিন বাস্তবতা আরও স্পষ্ট করে দেয়। পরবর্তী সময়ে সাধারণ চিকিৎসা থেকে সার্জারি এবং শেষ পর্যন্ত কার্ডিয়াক সার্জারিতে বিশেষায়িত হন তিনি। ১৯৯৩ সালে ইরান ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেস থেকে হৃদরোগ শল্যচিকিৎসায় সাব-স্পেশালিটি অর্জন করেন। পরে তাবরিজ ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেসের প্রধানের দায়িত্বও পালন করেন।

অর্থাৎ রাজনীতিতে আসার বহু আগেই তাঁর পরিচয়ের মূল ভিত্তি ছিল চিকিৎসা ও একাডেমিক জীবন।

যে দুর্ঘটনা বদলে দেয় পুরো জীবন

পেজেশকিয়ানের ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আসে ১৯৯৪ সালে। তাঁর স্ত্রী ফাতেমেহ মাজিদি ছিলেন একজন চিকিৎসক ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ। একটি সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি এবং তাঁদের এক সন্তান মারা যান।

একজন হৃদরোগ শল্যচিকিৎসক হিসেবে প্রতিদিন মানুষের জীবন বাঁচানোর লড়াই করা পেজেশকিয়ান নিজেই তখন জীবনের সবচেয়ে কঠিন ক্ষতির মুখোমুখি হন।

কিন্তু এই শোকের পর তাঁর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সামনে আসে তিনি আর বিয়ে করেননি। বাকি তিন সন্তানকে নিজেই বড় করার দায়িত্ব নেন। দ্য গার্ডিয়ানের জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি সন্তানদের বড় করার সময় রান্না করা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন নানা দায়িত্বও নিজেই সামলাতেন।

এভাবেই একজন কার্ডিয়াক সার্জন, শিক্ষক ও পরবর্তী সময়ে রাজনীতিকের পাশাপাশি তিনি হয়ে ওঠেন একক পিতা।

এই অভিজ্ঞতা তাঁর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ জানালা খুলে দেয়। তাঁর জীবনকে ঘিরে তৈরি হওয়া জন-ইমেজে দায়িত্ববোধ, পারিবারিক কর্তব্য এবং ব্যক্তিগত সংযমের বিষয়গুলো বারবার সামনে আসে। তবে তাঁর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক স্থাপন না করে এটিকে তাঁর জীবনযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবেই দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত।

তিন সন্তান, ভিন্ন তিন পথ

স্ত্রী ও এক সন্তানকে হারানোর পর পেজেশকিয়ানের জীবনে থেকে যায় তিন সন্তান জোহরা, মেহদি ও ইউসুফ। তাঁর মেয়ে জোহরা পেজেশকিয়ান রসায়নে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন এবং ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারে বাবার পাশে দৃশ্যমানভাবে ছিলেন। দ্য গার্ডিয়ানও তাঁকে পেজেশকিয়ানের রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করেছে।

জোহরার উপস্থিতি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে পেজেশকিয়ানের ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে। বাবার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা শুধু পারিবারিক সম্পর্কের দৃশ্য নয়, নির্বাচনী প্রচারের প্রকাশ্য ছবিতেও তা উঠে আসে।

তাঁর দুই ছেলে মেহদি ও ইউসুফ তুলনামূলকভাবে ব্যক্তিগত জীবন আড়ালে রেখেছেন। ইউসুফ পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাঁর লেখা ব্যক্তিগত ডায়েরি ও যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে।

অর্থাৎ রাষ্ট্রপ্রধানের পরিবারের সদস্য হলেও তাঁর সন্তানদের জীবন পুরোপুরি রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

ধর্মীয় অনুশীলন: কোরআন থেকে নাহজুল বালাগা

পেজেশকিয়ানের ব্যক্তিত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর ধর্মীয় অনুশীলন। তিনি কোরআন শিক্ষক এবং নাহজুল বালাগার পাঠ ও আবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত বলে বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে। নাহজুল বালাগা শিয়া ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয়-নৈতিক গ্রন্থ, যেখানে ইমাম আলীর ভাষণ, চিঠি ও উপদেশ সংকলিত হয়েছে।

এই ধর্মীয় পাঠ তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যেও মাঝে মাঝে প্রতিফলিত হয়েছে। বিশেষ করে ন্যায়বিচার, শাসকের দায়িত্ব, জনগণের অধিকার ও ক্ষমতার নৈতিক ব্যবহারের প্রশ্নে নাহজুল বালাগার ভাবধারা তাঁর বক্তব্যের একটি উল্লেখযোগ্য রেফারেন্স।

এখানে তাঁর ব্যক্তিত্বের দুটি ভিন্ন জগতকে পাশাপাশি দেখা যায় একদিকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সার্জারির কঠোর বাস্তবতা, অন্যদিকে ধর্মীয় ও নৈতিক দর্শনের দীর্ঘ ঐতিহ্য।

সরল জীবনযাপন ও ফুটবলের প্রতি টান

রাজনৈতিক ক্ষমতার শীর্ষে থাকলেও পেজেশকিয়ানের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিতে অনাড়ম্বর জীবনযাপনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর দীর্ঘ চিকিৎসকজীবন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তাঁকে প্রচলিত অভিজাত রাজনৈতিক জীবনের বাইরে একটি আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

তাঁর আরেকটি মানবিক দিক ফুটবলপ্রেম। তাবরিজের জনপ্রিয় ক্লাব ট্র্যাক্টর এসসির প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের সমর্থনের কথা বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। এমনকি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাবরিজে ফুটবল ম্যাচ দেখার কথাও প্রকাশ্যে এসেছে।

এটি তাঁর জনসম্পৃক্ততার আরেকটি দিককে সামনে আনে জাতীয় রাজনীতির জটিল আলোচনার বাইরে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগ।

চিকিৎসকের চোখে রাজনীতি?

পেজেশকিয়ানের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর চিকিৎসক পরিচয়ও গুরুত্বপূর্ণ। একজন কার্ডিয়াক সার্জনের কাজ হলো জটিল সমস্যাকে শনাক্ত করা, ঝুঁকি মূল্যায়ন করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে সমাধানের দিকে এগোনো।

তাঁর রাজনৈতিক ভাষ্যেও কখনও কখনও সমস্যাকে বাস্তবতার ভিত্তিতে দেখার এই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। তবে চিকিৎসক হওয়ার কারণে তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো সরাসরি চিকিৎসাবিজ্ঞানের পদ্ধতিতে পরিচালিত হয় এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। বরং বলা যায়, দীর্ঘ চিকিৎসকজীবন তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত পরিচয়ের একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে।

ট্র্যাজেডি থেকে তৈরি সংযম?

পেজেশকিয়ানের জীবনকে যদি একটি দীর্ঘ রেখায় দেখা যায়, তাহলে সেখানে কয়েকটি বড় বাঁক স্পষ্ট একটি বহুজাতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা, সামরিক জীবনে প্রান্তিক মানুষের কষ্ট দেখা, চিকিৎসক হওয়া, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জন, হৃদরোগ শল্যচিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত স্ত্রী ও সন্তান হারানোর ব্যক্তিগত বিপর্যয়।

এরপর একক পিতা হিসেবে তিন সন্তানকে বড় করা এবং ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ।

এই ঘটনাগুলো তাঁর ব্যক্তিত্বকে কীভাবে গড়ে দিয়েছে, তার সম্পূর্ণ উত্তর অবশ্যই তাঁর নিজের কাছ থেকেই আসতে পারে। তবে তাঁর প্রকাশ্য জীবন থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর জনপরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়েছে।

আজকের পেজেশকিয়ান তাই শুধু ইরানের প্রেসিডেন্ট নন; তিনি একই সঙ্গে একজন চিকিৎসক, যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষ, আজেরি-কুর্দি সাংস্কৃতিক পটভূমির সন্তান, ধর্মীয় পাঠে আগ্রহী ব্যক্তি এবং দীর্ঘদিন সন্তানদের একা লালন করা একজন বাবা।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়ন করতে হলে অবশ্যই নীতি, সিদ্ধান্ত ও রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব রেকর্ড আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের দিকে তাকালে বোঝা যায় ইরানের রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর আগেই বহু দশক ধরে নানা সামাজিক, পেশাগত ও পারিবারিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তাঁর ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠেছে।

আর সেই কারণেই মাসুদ পেজেশকিয়ানের জীবনী শুধু একজন রাজনীতিকের উত্থানের গল্প নয়; এটি একই সঙ্গে একজন চিকিৎসক, পিতা ও শোকাহত মানুষের দীর্ঘ জীবনসংগ্রামের গল্প।

এএম
আরও পড়ুন