মুসলিম দেশগুলোকে পরস্পরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল: পেজেশকিয়ান

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৪ পিএম

মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন তৈরি করে মধ্যপ্রাচ্যের সম্পদ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল, এমন অভিযোগ করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, মুসলিম দেশগুলোকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে এ অঞ্চলের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

পেজেশকিয়ান বলেন, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে, যাতে এ অঞ্চলের সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত হামলায় মুসলিম দেশগুলোর আকাশসীমা ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ইরানের প্রেসিডেন্টের ভাষ্য, তাদের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর সময় মুসলিম দেশগুলোর আকাশসীমা ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁর মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্যও উদ্বেগের কারণ।

সাক্ষাৎকারে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন পেজেশকিয়ান। তাঁর দাবি, ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে মতবিরোধ ও বিভাজন তৈরির চেষ্টা করছে দেশটির শত্রুরা। তবে এসব প্রচেষ্টা সফল হয়নি বলে দাবি করে তিনি বলেন, বর্তমানে ইরানে নজিরবিহীন ঐক্য ও সংহতি তৈরি হয়েছে।

পেজেশকিয়ান বলেন, শত্রুরা ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু ইরান এখন নজিরবিহীন ঐক্য ও সংহতি প্রত্যক্ষ করছে। তবে তাঁর এই মূল্যায়ন ইরানের প্রেসিডেন্টের নিজস্ব বক্তব্য; দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্যের মাত্রা স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করা কঠিন।

পেজেশকিয়ানের বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে আঞ্চলিক দেশগুলোও চাপের মধ্যে রয়েছে। আল জাজিরার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রপ্তানি এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

তবে হরমুজকে ঘিরে আলোচনার পথ খোলা রাখার কথাও জানিয়েছে ইরান। ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান বিশ্বের সঙ্গে সহযোগিতার জন্য হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। একই সময়ে হরমুজকে ইরানের বিরুদ্ধে নিরাপত্তাহীনতা তৈরির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের বিরোধিতাও করেন তিনি।

মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিও পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে। এর আগে সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের সরাসরি যুদ্ধ চলছে, এমন ধারণা প্রত্যাখ্যান করে তিনি আঞ্চলিক দেশগুলোকে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

তবে একই সময়ে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তাদের বক্তব্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূখণ্ড বা অবকাঠামো ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বেগ ও সতর্কতা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে পেজেশকিয়ানের বক্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমালোচনার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না জড়ানোর রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। তবে এটি বক্তব্যটির একটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক ব্যাখ্যা; পেজেশকিয়ান নিজে এমন উদ্দেশ্যের কথা সরাসরি বলেননি।

ইরানের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের বিষয়টিও তাঁর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা ও আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেও ইরান অভ্যন্তরীণভাবে ঐক্যবদ্ধ, এমন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা দেশটির নেতৃত্বের বক্তব্যে নিয়মিতই দেখা যাচ্ছে। পেজেশকিয়ানও সেই ধারাবাহিকতায় দাবি করেছেন, বাইরের শক্তিগুলো ইরানের অভ্যন্তরে বিভাজন উসকে দিতে চাইলেও তা সফল হয়নি।

এদিকে কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেজেশকিয়ানের জাতিসংঘ সফরের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে তৎপরতা ছিল এবং ওয়াশিংটনও আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি।

ফলে একদিকে ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছে, অন্যদিকে সংঘাতের অবসানে কূটনৈতিক পথও পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছে না।

এএস
আরও পড়ুন