সিএনএনের প্রতিবেদন

দুই মার্কিন পাইলটকে উদ্ধারের কাহিনি প্রচারে চাপ দিয়েছিলেন হেগসেথ

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৫ পিএম

ইরানের আকাশে ভূপাতিত মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের দুই সদস্যকে উদ্ধারের ঘটনাকে ঘিরে নির্মিত টেলিভিশন প্রতিবেদনকে ব্যাপকভাবে প্রচারের জন্য মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের দপ্তর চাপ প্রয়োগ করেছিল বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘৬০ মিনিটস’-এর জন্য দুই সদস্যের সাক্ষাৎকার নিশ্চিত করতে হেগসেথ ও তার দপ্তরের রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা সক্রিয় ছিলেন বলে একাধিক সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়েছে।

চলতি বছরের এপ্রিলে ইরানের ওপর মার্কিন হামলার সময় একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর এর দুই সদস্যকে উদ্ধারে অভিযান চালানো হয়। বিমানটির দুই সদস্যই শেষ পর্যন্ত উদ্ধার হন। তবে উদ্ধারের ঘটনাটি নিয়ে ‘৬০ মিনিটস’-এর প্রতিবেদনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে শুরুতে দুজনেরই আপত্তি ছিল বলে তিনটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে সিএনএন। এমনকি তাদের একজন আশঙ্কা করেছিলেন, তাকে হয়তো এই প্রতিবেদনে অংশ নিতে নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।

সূত্রগুলো বলেছে, হেগসেথের দপ্তরের রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা দুই সদস্যকেই সাক্ষাৎকারে বসানোর ব্যাপারে অনড় ছিলেন। তবে দুই সদস্য আপত্তি জানানোর পর হেগসেথ ব্যক্তিগতভাবে তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং অংশগ্রহণে তাদের ইচ্ছার বিষয়টি জানতে চান। এরপর একজন, যাকে ‘ব্রাভো’ নামে পরিচয় করানো হয়েছে, ক্যামেরার সামনে সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হন। অন্যজন, ‘আলফা’, ‘৬০ মিনিটস’-এর প্রতিবেদনে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানান।

পেন্টাগন এখনো ওই দুই সদস্যের পরিচয় প্রকাশ করেনি। সিএনএনও স্বাধীনভাবে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে ইরান থেকে তাদের উদ্ধারের ঘটনাটি ‘৬০ মিনিটস’-এর নতুন মৌসুমের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ঘটনাটি এমন সময়ে সামনে আনা হচ্ছে, যখন ইরান যুদ্ধ নিয়ে হেগসেথের দপ্তরকে সামরিক অভিযানের সাফল্যের একটি নির্দিষ্ট বয়ান তুলে ধরার চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। এ কারণে উদ্ধার অভিযানে মার্কিন সেনাদের ভূমিকা ও বীরত্বকে সামনে এনে ঘটনাটিকে উপস্থাপনের চেষ্টা নিয়ে সামরিক বাহিনীর কয়েকজন সদস্যের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

তবে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল সিএনএনের প্রতিবেদনকে পুরোপুরি মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি সংশ্লিষ্ট দুই পাইলটের নিজস্ব ছিল, কারণ ঘটনাটি তাদেরই গল্প। একজন অংশ নিয়েছেন এবং অন্যজন নেননি, এ বিষয়টিও সিএনএনের প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

উদ্ধার অভিযানটি ছিল যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। বিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পরপরই একজন সদস্যকে খুঁজে পাওয়া গেলেও অন্য সদস্যটি এক দিনেরও বেশি সময় ধরে ইরানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়া এড়িয়ে চলেন। দুর্গম ভূখণ্ড পেরিয়ে তিনি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাত হাজার ফুট উঁচু একটি পাহাড়ি চূড়ায় পৌঁছান। তার সঙ্গে ছিল একটি পিস্তল, যোগাযোগের একটি যন্ত্র এবং অবস্থান শনাক্তের একটি সংকেতযন্ত্র।

পরে মার্কিন কমান্ডোদের একটি দল তাকে উদ্ধার করে। ওই অভিযানের সময় মার্কিন বিমান থেকে ওই এলাকায় বোমা ফেলে পথ পরিষ্কার করার চেষ্টা করা হয়। উদ্ধার হওয়া ওই সদস্যই পরে ‘৬০ মিনিটস’-এ সাক্ষাৎকার দিতে সম্মত হন। অন্য সদস্য এতে অংশ নেননি।

তবে চলমান যুদ্ধের মধ্যে উদ্ধার অভিযানের গোপন সামরিক কৌশল বা অন্যান্য শ্রেণিবদ্ধ তথ্য প্রকাশের আশঙ্কা নিয়েও সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ ছিল। সূত্রগুলোর দাবি, সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এমন উদ্বেগ জানানো হলেও হেগসেথের দপ্তরের রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা সাক্ষাৎকারটি এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেন।

জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে অনিচ্ছাকৃতভাবে সামরিক কৌশল শত্রুর কাছে প্রকাশিত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন বলে একটি সূত্র দাবি করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত তিনিও অনুষ্ঠানের অংশ হন। তার মুখপাত্র জোসেফ হলস্টেড এ বিষয়ে বেনামি সূত্রের বক্তব্য নিয়ে মন্তব্য না করে বলেন, কাউকে পেছনে ফেলে না যাওয়ার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনী সম্ভাব্য সবকিছু করবে।

এদিকে দুই সদস্যের সাক্ষাৎকার পেতে মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিবিএসও কয়েক মাস ধরে চেষ্টা চালায়। ‘৬০ মিনিটস’-এর প্রযোজক কিথ শারম্যান উদ্ধার অভিযানের দিনই মার্কিন সামরিক বাহিনীর দীর্ঘদিনের পরিচিতদের মাধ্যমে সাক্ষাৎকারের উদ্যোগ নেন। পরে সিবিএসের প্রধান সম্পাদক বারি ওয়েইসও বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেন এবং হেগসেথের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে একান্ত সাক্ষাৎকারের সুযোগ পাওয়ার চেষ্টা করেন বলে সিবিএসের তিনটি সূত্র জানিয়েছে।

সাক্ষাৎকারটি কয়েক মাসের চেষ্টার পর নিশ্চিত হয়। জুলাইয়ের মাঝামাঝি একজন পাইলটের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলেও শেষ পর্যন্ত সেটি বাতিল হওয়ার আশঙ্কা ছিল। আগস্টের মাঝামাঝি সাক্ষাৎকার ধারণ করা হয়। নতুন মৌসুমের প্রথম পর্বেই ইরান থেকে উদ্ধার অভিযানের এই কাহিনি প্রচার করতে চেয়েছিল সিবিএস।

হেগসেথ নিজেও ‘৬০ মিনিটস’-এর এই প্রতিবেদনে বিরল এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। অনুষ্ঠানটির প্রচারপূর্ব প্রকাশিত একটি অংশে ‘ব্রাভো’কে নীরবে বসে থাকতে দেখা যায়। তখন প্রতিবেদক নোরাহ ও’ডনেল তাকে প্রশ্ন করেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী তাকে উদ্ধার করতে আসবে, এ নিয়ে তার কখনো কোনো সন্দেহ হয়েছিল কি না। এভাবেই ইরান থেকে মার্কিন দুই সদস্যকে উদ্ধারের ঘটনাকে ঘিরে নির্মিত প্রতিবেদনটি সামনে এনেছে সিবিএস। সূত্র: সিএনএন

এএস
আরও পড়ুন