ট্রাম্পের অনুরোধ উপেক্ষা, হামলা অব্যাহত রাখার ঘোষণা জেলেনস্কির

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৮ পিএম

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুরোধে রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলা সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তাঁর অভিযোগ, ইউক্রেন রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা সীমিত রাখলেও মস্কো ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনায় আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে। এমন পরিস্থিতিতে রুশ জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

জেলেনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে তিন দিনের জন্য রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় সীমিত আকারে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কিয়েভ। কিন্তু এই সময়েও রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করেনি। ফলে হামলা সীমিত রাখার বিষয়ে আর কোনো বাধ্যবাধকতা মানতে রাজি নন তিনি।

রাশিয়ার রিয়াজান তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের বড় ধরনের হামলার চেষ্টা প্রতিহত করার দাবি করেছে মস্কো। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, শোধনাগার লক্ষ্য করে ছোড়া চারটি ক্ষেপণাস্ত্র এবং কয়েক ডজন ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। তবে ভূপাতিত অস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে সেখানে আগুন ধরে যায়।

এর আগে রাশিয়া ও ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ রাখার বিষয়ে একটি সমঝোতার কথা জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। রোববার তিনি ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’র ঘোষণা দেন। জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়াও একই শর্ত মানলে ইউক্রেন তাতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, সমঝোতার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাশিয়া আবার হামলা চালায়। তবে ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে ওই সমঝোতার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।

জেলেনস্কির অভিযোগ, ইউক্রেন যেন রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ রাখে, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছিল। তবে ট্রাম্প গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ বন্ধ করার কথা অস্বীকার করেছেন।

রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের আগাম সতর্কতামূলক গোয়েন্দা তথ্য ইউক্রেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ড্রোন পরিচালনা ও প্রতিরক্ষার বিভিন্ন কাজে স্টারলিংক সেবাও ব্যবহার করে দেশটি। সম্প্রতি স্টারলিংক ও স্টারশিল্ডের কিছু কার্যক্রম আবার সচল হয়েছে। তবে স্টারলিংক ব্যবহার করে পরিচালিত ড্রোনের ওপর গতিসংক্রান্ত বিধিনিষেধ কতটা শিথিল হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। জেলেনস্কির দাবি, সেবায় বিঘ্ন ঘটার বিষয়টি কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি ছিল না, বরং ইচ্ছাকৃতভাবে তা করা হয়েছিল।

ইউক্রেনের দাবি, বুধবার রাশিয়ার হামলায় দেশটিতে ১৩ জন নিহত হয়েছেন। জেলেনস্কি জানান, কয়েক ডজন স্থানে ৮৫০টির বেশি ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। কিরোভোহরাদ অঞ্চলে ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার অভিযান শুরুর পর সবচেয়ে বড় হামলা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। ওই অঞ্চলে প্রায় ১০ ঘণ্টা ধরে ৩৬০টির মতো ড্রোনের হামলায় অন্তত তিনজন নিহত হন। এ ছাড়া দোনেৎস্ক, খেরসন ও ভলিন অঞ্চলেও প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।

রাশিয়ার তেল অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের বিষয়ে জেলেনস্কি আরও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেনকে অতিরিক্ত প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করে, কেবল তখনই এ ধরনের হামলা বন্ধ রাখার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে কিয়েভ। ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুতের ওপর চাপ বাড়ায় ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।

এদিকে রাশিয়ার কাছ থেকে তিন লাখ টন ডিজেল যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহের বিষয়ে একটি চুক্তির সমালোচনা করেছেন জেলেনস্কি। তাঁর মতে, এ ধরনের উদ্যোগ কার্যত রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে সহায়তা করছে। ইরান যুদ্ধের কারণে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল রাখা ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম লক্ষ্য। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টিও ওয়াশিংটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ইউক্রেনকে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সহায়তা সীমিত করার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রসেত্তো। তাঁর মতে, কিয়েভের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি কমিয়ে দেওয়া হবে বড় ধরনের ভুল। তিনি বলেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যখন বুঝতে পারবেন যে যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো পক্ষই সহজে জয়ী হতে পারছে না, তখনই শান্তির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা কমিয়ে দিলে পুতিনের মনে হতে পারে, শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার জয়ের সুযোগ রয়েছে।

বুধবার লন্ডন সফরে গিয়ে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের সঙ্গে বৈঠক করেন জেলেনস্কি। এ সময় ইউক্রেনের জন্য হালকা ও বহুমুখী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের গতি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয় যুক্তরাজ্য।

ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের প্রসঙ্গেও কথা বলেছেন জেলেনস্কি। তাঁর অভিযোগ, ট্রাম্পের কর্তৃত্ববাদী নেতাদের প্রতি একধরনের অনুরাগ রয়েছে, যার মধ্যে পুতিনও রয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের বিষয়ে জেলেনস্কি বলেন, সম্পর্ক নষ্ট করেনি ইউক্রেন; তাই তা মেরামতের দায়ও কিয়েভের নয়। এর আগে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প ও জেলেনস্কির মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছিল।

জেলেনস্কির বক্তব্য, রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে হামলা বাড়িয়ে চলেছে এবং একই সময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার উদ্যোগ ও ইউক্রেনের ওপর চাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টাকে কাজে লাগাচ্ছে। তাঁর অবস্থান থেকে স্পষ্ট, রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে গেলে মস্কোর জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে প্রস্তুত নয় কিয়েভ। সূত্র: সিএনএন

এএস
আরও পড়ুন