তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় খামেনির মরদেহ, শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৬, ০২:০০ পিএম

দীর্ঘ ৩৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইরানের শাসনভার পরিচালনা করা সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। বিদায়ী এই নেতার মরদেহ ইতোমধ্যে তেহরানের ঐতিহ্যবাহী গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে নিয়ে আসা হয়েছে।

ইরানি প্রশাসন ধারণা করছে, খামেনির এই অন্তিম বিদায়ে প্রায় দুই কোটি মানুষের ঢল নামতে পারে। আর এমনটি হলে, এটিই হবে ইরানের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ এবং ঐতিহাসিক কোনো শেষকৃত্যের মহাসমাবেশ।

আল জাজিরা, এএফপি ও সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় জানাজায় পরিণত হতে পারে। এজন্য সরকারি কর্মকর্তা, সেনাবাহিনী, বিশ্ববিদ্যালয়, শ্রমিক সংগঠন, ত্রাণকর্মী এবং ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে যুক্ত করে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

এদিকে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা ও নিজের বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজার নামাজ পড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। তবে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে নিরাপত্তাবাহিনী তাকে এ বিষয়ে অনুমতি দেয়নি। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) ভারতে নিযুক্ত সুপ্রিম লিডারের প্রতিনিধি হাকিম ইলাহী ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডেকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে আসতে চেয়েছিলেন মোজতবা। কিন্তু নিরাপত্তাবাহিনী জানিয়েছে, এটি তার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে।

হাকিম ইলাহী বলেন, গত সপ্তাহে আমি ইরানে ছিলাম এবং কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করেছি, যারা মোজতবা খামেনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি তাদের বলেছেন, তিনি প্রকাশ্যে আসতে চান। এমনকি তিনি জানাজার নামাজও পড়াতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নিরাপত্তাবাহিনী তাকে এতে সমর্থন জানায়নি।

তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তাবাহিনী বলেছে, এটি তার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হবে এবং তারা তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। তাই আমার মনে হয়, তিনি প্রকাশ্যে আসবেন না।

আলী খামেনির জানাজার নামাজ পড়ানোর জন্য মোজতবা কাউকে মনোনীত করেছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে হাকিম ইলাহী বলেন, না, তিনি কারও নাম বলেননি। পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে নতুন সর্বোচ্চ নেতাই জানাজার নামাজ পড়াতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরিস্থিতি এখন অনুকূলে নেই।

এদিকে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় আজ শুক্রবার ভোর থেকেই শোকাবহ পরিবেশের মধ্য দিয়ে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তার সহযোগীদের দাফন প্রক্রিয়া অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব শুরু হয়েছে। সম্প্রতি সংঘটিত ৪০ দিনের যুদ্ধের শুরুর দিন মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হন। তার এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক প্রয়াণে পুরো ইরানে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। আজ ভোরেই এই নেতার মরদেহ তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লার মূল প্রার্থনা কক্ষে নিয়ে আসা হয়, যেখানে দুই দিনব্যাপী সাধারণ জনগণের শেষ বিদায়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আজ প্রথম দিনেই মরহুম নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হয়েছেন ইন্দোনেশিয়া ও আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় পণ্ডিত এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। পাশাপাশি ইরানের স্বীকৃত ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও এই শোকযাত্রায় শামিল হয়েছেন। এছাড়া রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান, ভারত, জর্জিয়া ও কিউবাসহ বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিদল ইতিমধ্যে তেহরানে এসে পৌঁছেছেন। এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আয়াতুল্লাহ খামেনির কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধে শহীদ হওয়া পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একটি ব্যক্তিগত বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল।

এই ঐতিহাসিক ও শোকাবহ মুহূর্তে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বার্তায় দলমত, জাতি ও ধর্ম নির্বিশেষে দেশের সর্বস্তরের মানুষকে এই জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বীর ইরান যখন ইসলাম ও বিপ্লবের এই পরম সেবককে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন জাতীয় ঐক্য এবং ইসলামি ব্যবস্থার সুউচ্চ আদর্শের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে সবাইকে ঐতিহাসিক সংখ্যায় উপস্থিত হতে হবে।

ঘোষিত সময়সূচী অনুযায়ী, আগামী শনিবার ও রোববার মোসাল্লায় সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সোমবার তেহরানে মূল জানাজা ও বিশাল শোকমিছিল অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মরদেহ পবিত্র শহর কোমে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখান থেকে ইরাকের বাগদাদ, কারবালা ও নাজাফে বিশেষ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগামী ৯ জুলাই ইরানের মাশহাদ শহরে এই মহান নেতার দাফন সম্পন্ন হবে।

YA
আরও পড়ুন