প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকারকে দেওয়া ৩৫ হাজার রুপি ঋণ ১০৯ বছর পর সুদসহ ফেরত চেয়েছে ভারতের মধ্যপ্রদেশের রুঠিয়া পরিবার। ব্যবসায়ী জুম্মালাল রুঠিয়ার দেওয়া ওই ঋণের প্রমাণ হিসেবে ১৯১৭ সালের ৪ জুনের একটি সনদ তাদের কাছে রয়েছে বলে দাবি করেছে পরিবারটি। বিষয়টি সামনে আসার পর যুক্তরাজ্যের ডেট ম্যানেজমেন্ট অফিস (ডিএমও) পরিবারের কাছে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র চেয়ে পাঠিয়েছে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধরত ভারতীয় সেনাদের ভরণপোষণের জন্য তহবিল সংগ্রহ করছিল তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ভোপাল এজেন্সিতে কর্মরত এক ব্রিটিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে জুম্মালাল রুঠিয়া সরকারকে ৩৫ হাজার টাকা ঋণ দেন।
জুম্মালাল রুঠিয়ার প্রপৌত্র গৌতম রুঠিয়া জানিয়েছেন, ব্রিটিশ কর্মকর্তারা বিষয়টি বিস্তারিত পর্যালোচনার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছেন। তিনি বলেন, ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে একটি ই-মেইল পেয়েছেন তাঁরা। সেখানে দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য বেশ কিছু তথ্য ও নথি চাওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান তিনি।
তবে এখনো রুঠিয়া পরিবারের দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেনি ব্রিটিশ সরকার। নথিপত্র চাওয়ার বিষয়টি মূলত দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ের প্রাথমিক প্রক্রিয়ার অংশ।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পুরোনো নথিপত্র ঘাঁটতে গিয়ে ঋণের সনদটি খুঁজে পায় পরিবারটি। জুম্মালালের নাতি ও গৌতম রুঠিয়ার বাবা বিনয় রুঠিয়া জানান, অন্য একটি মামলার কাজে পুরোনো কাগজপত্র খোঁজার সময় ব্রিটিশ সরকারকে দেওয়া ওই ঋণের নথি পাওয়া যায়। পরে একজন আইনজীবীর মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
কয়েক মাস পর যুক্তরাজ্য সরকারের কাছ থেকে প্রথমবারের মতো সাড়া পেয়ে পরিবারটি আশাবাদী হয়ে উঠেছে। বিনয় রুঠিয়ার ভাষায়, বিষয়টি শুধু অর্থ ফেরত পাওয়ার নয়; এর সঙ্গে পরিবারের পৈতৃক ঐতিহ্য ও ইতিহাসও জড়িয়ে আছে।
ঋণের মেয়াদ প্রসঙ্গে গৌতম রুঠিয়া বলেন, সাধারণ ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে পাঁচ বা ১০ বছরের মতো নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে। কিন্তু এটি ছিল যুদ্ধকালীন ঋণ। যুদ্ধ কতদিন চলবে সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা না থাকায় নথিতে ঋণ পরিশোধের নির্দিষ্ট মেয়াদ উল্লেখ করা হয়নি।
দাবিটি যাচাই করতে যুক্তরাজ্যের ডেট ম্যানেজমেন্ট অফিস পরিবারটির কাছে বেশ কিছু তথ্য চেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক নথি, বংশতালিকা, পুরোনো সনদ, ঋণের পরিমাণ এবং সে সময় ব্যবহৃত সংশ্লিষ্ট ফর্মের তথ্য। পরিবারের ধারণা, ১৯১৭ সালে যাঁরা অর্থ দিয়েছিলেন এবং বর্তমানে যাঁরা অর্থ ফেরতের দাবি করছেন, তাঁদের মধ্যে পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে—এটি প্রমাণ করতেই এসব নথি চাওয়া হয়েছে।
ঋণের বর্তমান মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের দাবি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে পরিবারটি। তাদের হিসাব অনুযায়ী, মূল ৩৫ হাজার টাকার সঙ্গে সাধারণ সুদ, চক্রবৃদ্ধি সুদ, সংশ্লিষ্ট ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির হিসাবও যুক্ত করা হবে। এরপর বর্তমান বাজারমূল্যের সঙ্গে তা সমন্বয় করা হবে। তবে সব হিসাব শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত দাবির অঙ্ক নির্ধারণ করা হয়নি।
গৌতম রুঠিয়া বলেন, মূল ঋণের পাশাপাশি সুদ, চক্রবৃদ্ধি সুদ এবং এ সংক্রান্ত যেসব ব্যয় হয়েছে, সেগুলোও তাঁরা দাবি করবেন। এরপর বর্তমান সময়ের অর্থমূল্যের সঙ্গে তা তুলনা করে চূড়ান্ত অঙ্ক নির্ধারণ করা হবে।
বিনয় রুঠিয়ার দাবি, ২০১৫ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নেওয়া বিভিন্ন ঋণের বিপরীতে ব্রিটিশ সরকার মোট প্রায় ২২০ কোটি পাউন্ড পরিশোধ করেছিল। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দেওয়া এক সরকারি জবাবেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট প্রায় ২২০ কোটি পাউন্ড বকেয়া ঋণের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এর মধ্যে যুদ্ধকালীন ঋণ ২০১৫ সালের ৯ মার্চ পরিশোধ করা হয়। একই বছর ১০ লাখ পাউন্ডের একটি কনসোলিডেটেড ঋণ এবং একটি কনভার্শন ঋণও পরিশোধ করা হয়েছিল।
পার্লামেন্টে দেওয়া আরেকটি সরকারি জবাব অনুযায়ী, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অর্থ সংগ্রহের জন্য জারি করা সরকারি বন্ডগুলোর মধ্যে কনসোলিডেটেড বন্ডের সুদের হার ছিল ৪ শতাংশ এবং যুদ্ধকালীন বন্ডের হার ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ওই সময় জারি করা মোট যুদ্ধকালীন বন্ডের প্রায় ৯৯ শতাংশই ছিল এই দুই ধরনের বন্ড।
তবে ২০১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার যে ঋণ পরিশোধ করেছিল, তার মধ্যে ১৯১৭ সালে জুম্মালাল রুঠিয়ার দেওয়া ৩৫ হাজার টাকাও ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জুম্মালাল রুঠিয়া সে সময় এলাকার একজন বিত্তশালী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ছিলেন। তাঁর প্রায় তিন হাজার গরু নিয়ে একটি গোশালা ছিল এবং তিনি আফিম চাষের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। পরিবারটির কাছে তাঁর পুরোনো ছবি এবং সে সময় ব্যবহৃত একটি রোলস-রয়েস গাড়ির ছবিও সংরক্ষিত রয়েছে।
বিনয় রুঠিয়ার দাবি, জুম্মালালের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ ছিল এবং ঋণ দেওয়ার প্রামাণ্য নথিও তাঁদের হাতে রয়েছে। তাঁর মতে, মূল প্রশ্ন জুম্মালাল ঋণ দিয়েছিলেন কি না, তা নয়; বরং এত বছর পর এ বিষয়ে ব্রিটিশ সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ঋণ দেওয়ার প্রায় দুই দশক পর, ১৯৩৭ সালে মারা যান জুম্মালাল রুঠিয়া। এর এক দশক পর ১৯৪৭ সালে ভারত ছেড়ে চলে যায় ব্রিটিশ সরকার। রুঠিয়া পরিবারের দাবি, ওই ঋণের অর্থ পরবর্তীতে কখনো ফেরত দেওয়া হয়নি এবং বিষয়টিরও কোনো নিষ্পত্তি হয়নি।
বর্তমানে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের চাওয়া নথিপত্র সংগ্রহ ও সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছে পরিবারটি। এসব নথি যাচাইয়ের পাশাপাশি ১৯১৭ সালের ঋণসংক্রান্ত সনদের সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের নিজস্ব রেকর্ডও মিলিয়ে দেখা হবে। প্রমাণের ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে আইনি পদক্ষেপ কিংবা সালিসের পথেও যাওয়ার কথা জানিয়েছে পরিবারটি।
বিনয় রুঠিয়া জানিয়েছেন, মূল নথিপত্র ও সরকারি রেকর্ড যাচাই শেষ হওয়ার পরই তাঁরা পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
ট্রাম্পকে ‘খেলাচ্ছে’ ইরান
টুইট করে হরমুজ প্রণালি দখল করা সম্ভব নয়: ইরান
চীনের চাপের মধ্যেই তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদন
হরমুজ অবরোধে আব্রাহাম লিংকনকে সরিয়ে আনা হচ্ছে জর্জ ওয়াশিংটন
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত ৭