হঠাৎ কিমের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছেন ট্রাম্প, নেপথ্যে কী?

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩৮ এএম

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে আবারও ঘনিষ্ঠ হতে চাইছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কয়েক বছর ধরে কার্যত স্থবির হয়ে থাকা ওয়াশিংটন-পিয়ংইয়ং কূটনীতিতে হঠাৎ নতুন তৎপরতা দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প শুধু কিমের সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরছেন না, চলতি বছরেই তাঁর সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনার কথাও প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। কিন্তু উত্তর কোরিয়া এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী। ফলে প্রশ্ন উঠছে—কেন এই মুহূর্তে ট্রাম্প কিমের দরজায় আবার কড়া নাড়ছেন?

ট্রাম্পের উত্তর কোরিয়া নীতির সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক ছিল কিমের সঙ্গে সরাসরি ব্যক্তিগত যোগাযোগ। প্রথম মেয়াদে দুজনের মধ্যে সিঙ্গাপুর ও হ্যানয়ে শীর্ষ বৈঠক হয়। ২০১৯ সালে কোরীয় সীমান্তে তাঁদের সাক্ষাৎও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নজির তৈরি করেছিল।

সেই ব্যক্তিগত সম্পর্ককেই আবার কাজে লাগাতে চাইছেন ট্রাম্প। আগস্টে তিনি বলেন, কিমের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো এবং তিনি চলতি বছরই উত্তর কোরীয় নেতার সঙ্গে দেখা করবেন। ট্রাম্পের দাবি, কিম তাঁর সাম্প্রতিক যোগাযোগের জবাবও দিয়েছেন।

তবে পিয়ংইয়ংয়ের বক্তব্য অনেক বেশি সতর্ক। কিমের বোন ও প্রভাবশালী কর্মকর্তা কিম ইয়ো জং সম্প্রতি ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগের দাবির বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ ট্রাম্প যতটা আগ্রহ দেখাচ্ছেন, উত্তর কোরিয়া ততটা দ্রুত সাড়া দিচ্ছে না।

ট্রাম্পের নতুন উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়ার পরিসর কমিয়ে দেওয়া। ওয়াশিংটন-পিয়ংইয়ং সম্পর্কের ক্ষেত্রে এসব মহড়া বরাবরই বড় বিরোধের কারণ। উত্তর কোরিয়া এগুলোকে নিজেদের বিরুদ্ধে সামরিক প্রস্তুতি হিসেবে দেখে।

ট্রাম্প এবার মহড়াকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ ও উসকানিমূলক হিসেবে দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এমন পদক্ষেপ কিমের জন্য সরাসরি একটি কূটনৈতিক বার্তা—ওয়াশিংটন চাইলে উত্তেজনা কমানোর পথে যেতে প্রস্তুত।

কিন্তু পিয়ংইয়ং এই ছাড়কে যথেষ্ট মনে করেনি। বরং মহড়ার মধ্যেই উত্তর কোরিয়া প্রায় ১০টি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের ছাড়ের পরও কিম সরকার নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করে বুঝিয়ে দিয়েছে যে শুধু সামরিক মহড়া কমানো দিয়ে তাদের সন্তুষ্ট করা যাবে না।

২০১৮-১৯ সালে ট্রাম্প যখন কিমের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন, তখনও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি বড় উদ্বেগের বিষয় ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে পরিস্থিতি আরও বদলেছে।

ট্রাম্প নিজেই সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার কাছে ৫৭টি ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। যদিও এই সংখ্যা নিয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের প্রশ্ন রয়েছে, তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা পরিষ্কার—উত্তর কোরিয়াকে এখন আর আগের অবস্থানে দেখা যাচ্ছে না।

এর পাশাপাশি রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্কও আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সামরিক সহযোগিতা বেড়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মোকাবিলায় কিমের হাতে আগের চেয়ে বেশি কূটনৈতিক বিকল্প রয়েছে।

ট্রাম্পের হিসাবের একটি বড় অংশ সম্ভবত এশিয়ার ভূরাজনীতি। উত্তর কোরিয়া যদি ক্রমেই রাশিয়া ও চীনের দিকে ঝুঁকে যায়, তাহলে পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও কৌশলগত অবস্থান নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

তাই কিমের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা শুধু পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্ন নয়; এটি উত্তর কোরিয়াকে পুরোপুরি রাশিয়া-চীন বলয়ের দিকে চলে যাওয়া ঠেকানোর একটি কৌশলও হতে পারে।

তবে এখানে একটি সমস্যা আছে। কিম এখন আর ২০১৮ সালের কিম নন। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক তাঁকে ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর সুযোগ দিয়েছে। ফলে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত কূটনীতি এবার আগের মতো কার্যকর হবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

ট্রাম্পের জন্য কিমের সঙ্গে একটি সফল বৈঠক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব। প্রথম মেয়াদে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করে তিনি নিজেকে প্রচলিত কূটনীতির বাইরে গিয়ে ‘চুক্তি করাতে সক্ষম’ নেতা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।

এবারও যদি তিনি কিমকে আলোচনার টেবিলে আনতে পারেন, তাহলে সেটিকে নিজের পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য হিসেবে দেখানোর সুযোগ পাবেন। বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক তৎপরতার পেছনে এমন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হিসাব রয়েছে।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত এখানেই। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনার অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণকে সামনে রেখেছে। কিন্তু পিয়ংইয়ং এখন নিজেদের পারমাণবিক শক্তিকে দর-কষাকষির বিষয় হিসেবে নয়, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্থায়ী ভিত্তি হিসেবে দেখতে চাইছে।

তাই ট্রাম্প যদি আগের মতো ‘পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ’কে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু করেন, তাহলে কিমের সঙ্গে সমঝোতা কঠিন হতে পারে। বরং উত্তর কোরিয়া চাইতে পারে নিষেধাজ্ঞা শিথিল, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং নিজেদের পারমাণবিক শক্তির বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা।

এ কারণেই ট্রাম্পের জন্য কিমের সঙ্গে বৈঠক আয়োজন করা যতটা সহজ মনে হচ্ছে, কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছানো ততটা সহজ নয়।

ট্রাম্পের কিম-ঘনিষ্ঠ হওয়ার প্রচেষ্টায় দক্ষিণ কোরিয়ার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিউল যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কিন্তু সামরিক মহড়া কমানোর সিদ্ধান্ত দক্ষিণ কোরিয়ায় উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ সিউলের আশঙ্কা, ওয়াশিংটন-পিয়ংইয়ং সম্পর্ক উন্নত করার নামে যুক্তরাষ্ট্র যদি অতিরিক্ত ছাড় দেয়, তাহলে দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আগের অবস্থান থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-কিম সমঝোতার পথ আগের চেয়ে আরও জটিল।

সামনে কী হতে পারে?

সবকিছু মিলিয়ে ট্রাম্পের নতুন উদ্যোগকে সরাসরি ‘বন্ধুত্ব’ বলা ঠিক হবে না। বরং এটি পারমাণবিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, রাশিয়া-চীন প্রভাব মোকাবিলা, দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তা এবং নিজের কূটনৈতিক সাফল্য—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করা একটি কৌশল।

ট্রাম্প কিমের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে বড় সম্পদ হিসেবে দেখছেন। কিন্তু কিমের হাতে এখন আরও বেশি বিকল্প। তাই ওয়াশিংটন যতটা আগ্রহী, পিয়ংইয়ং ততটা তাড়াহুড়ো করছে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ট্রাম্প যদি কিমকে আলোচনায় আনতেও পারেন, তাহলে পরবর্তী প্রশ্ন হবে, কী নিয়ে সমঝোতা হবে? পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ, নিষেধাজ্ঞা, সামরিক মহড়া, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা—প্রতিটি বিষয়েই দুই পক্ষের অবস্থান এখনো অনেক দূরে।

সুতরাং কিমের আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার ট্রাম্পের চেষ্টা হঠাৎ কোনো আবেগের ফল নয়। এর পেছনে রয়েছে বদলে যাওয়া এশীয় ভূরাজনীতি, উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক সক্ষমতা, রাশিয়া-চীন ঘনিষ্ঠতা এবং ট্রাম্পের নিজের কূটনৈতিক সাফল্য দেখানোর আকাঙ্ক্ষা। দরজা আবার খুলছে ঠিকই, কিন্তু এবার সেই দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কিম আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী দর-কষাকষির অবস্থানে।

Maz
আরও পড়ুন