ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আটকাতে পশ্চিমাদের নতুন কৌশল

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৬ এএম

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের তিন দেশ। ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধসংক্রান্ত (NPT) বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে দেশটিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানোর লক্ষ্যে একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি।

কূটনীতিকদের বরাত দিয়ে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP) ও রয়টার্স জানিয়েছে, প্রস্তাবটি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) ৩৫ সদস্যের বোর্ড অব গভর্নরসের বৈঠকে বিবেচনার জন্য তৈরি করা হয়েছে। তবে এটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বোর্ডে জমা দেওয়া হয়নি। ফলে আলোচনার মাধ্যমে এর ভাষা ও বিষয়বস্তু পরিবর্তিত হতে পারে। আগামী সপ্তাহের বৈঠকে এটি উত্থাপিত হওয়ার কথা রয়েছে।

NPT-এর অধীনে ইরানের ওপর তার সব পারমাণবিক উপাদান ও কার্যক্রম ঘোষণা এবং সেগুলো শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য IAEA পরিদর্শকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, তেহরান এই বাধ্যবাধকতা পুরোপুরি পালন করছে না।

খসড়া প্রস্তাবে IAEA-এর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসিকে প্রস্তাবটি এবং এর আগে গৃহীত সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবগুলো IAEA-এর সদস্য দেশ, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদের কাছে পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানকে তার সেফগার্ডস চুক্তির আওতায় থাকা বাধ্যবাধকতা জরুরি ভিত্তিতে পূরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

পরমাণু স্থাপনায় প্রবেশাধিকার নিয়ে অচলাবস্থা

ইরানের সঙ্গে IAEA-এর বিরোধের মূল বিষয়গুলোর একটি হলো পরমাণু স্থাপনায় আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার। ২০২৫ সালের জুনে ইরানের পরমাণু স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোতে IAEA পরিদর্শকরা এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে ফিরতে পারেননি। ফলে দেশটির মজুত করা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কেও সংস্থাটি পূর্ণাঙ্গভাবে যাচাই করতে পারছে না।

IAEA-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, হামলার আগে ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা প্রায় ৪৪০ দশমিক ৯ কেজি ইউরেনিয়াম ছিল। এই মাত্রার সমৃদ্ধকরণ অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় ৯০ শতাংশ মাত্রার কাছাকাছি। IAEA-এর হিসাব অনুযায়ী, আরও সমৃদ্ধ করা হলে ওই পরিমাণ ইউরেনিয়াম তাত্ত্বিকভাবে প্রায় ১০টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ইরানের কাছে বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে।

IAEA বলেছে, পরমাণু উপাদানের অবস্থান ও পরিমাণ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে প্রবেশাধিকার না পাওয়ার বিষয়টি ‘পারমাণবিক বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ’ তৈরি করছে এবং এর জরুরি সমাধান প্রয়োজন।

নিরাপত্তা পরিষদে গেলেও বাধা কোথায়?

ইরানকে নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানোর প্রস্তাব পাস হলেও পরবর্তী পর্যায়ে দেশটির বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হতে পারে। কারণ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাশিয়া ও চীন ইরানের ঘনিষ্ঠ অংশীদার এবং তাদের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা বা অন্যান্য বাধ্যতামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ আটকে যেতে পারে।

তবে নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিজেই ইরানের ওপর উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। রয়টার্সের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি হবে প্রায় দুই দশকের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক ইস্যুতে IAEA বোর্ডের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা দীর্ঘদিনের অচলাবস্থাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দেবে।

ইরানের অবস্থান

ইরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে এবং দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না। NPT-এর সদস্য হিসেবে শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক প্রযুক্তি ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের রয়েছে বলেও তেহরান যুক্তি দিয়ে আসছে।

এদিকে পশ্চিমা দেশগুলো বলছে, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকার থাকলেও আন্তর্জাতিক পরমাণু পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে সহযোগিতা করা এবং পারমাণবিক উপাদানের বিষয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখা ইরানের আইনি বাধ্যবাধকতা।

খসড়া প্রস্তাবের মধ্যেও কূটনৈতিক সমাধানের প্রতি সমর্থনের কথা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ ইরানকে নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানোর উদ্যোগের পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের সমাধানের পথ খোলা রাখার চেষ্টা করছে পশ্চিমা শক্তিগুলো।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন