কুড়িগ্রামে সারের সরবরাহ স্বাভাবিক, কমেছে কৃষকদের উদ্বেগ

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪২ পিএম

কুড়িগ্রামে সারের সরবরাহ ও বিতরণ নিয়ে সৃষ্ট সাময়িক অস্থিরতা কাটতে শুরু করেছে। অবৈধ মজুদের বিরুদ্ধে অভিযান, মজুত করা সার উদ্ধার, ডিলারদের তদারকি এবং সমন্বিতভাবে সার বিতরণের উদ্যোগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে। এতে কৃষকদের মধ্যেও উদ্বেগ কমেছে।

প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, জেলায় সারের প্রকৃত সংকট নেই। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সার কেনা ও মজুদের প্রবণতা এবং সংকটের গুজব ছড়িয়ে পড়ায় কোথাও কোথাও সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে সার মজুদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে মজুত করা সার উদ্ধার ও কয়েকজন ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি ডিলারদের সার বিতরণ কার্যক্রম তদারকি করা হচ্ছে, যাতে প্রকৃত কৃষকেরা নিয়ম অনুযায়ী সার পান।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জেলার ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী ও রৌমারীর বিভিন্ন সার ডিলার পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, কৃষকদের উপস্থিতি বেড়েছে। কোথাও দীর্ঘ সারি ও সাময়িক উত্তেজনা দেখা দিলেও প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

রৌমারী উপজেলার মহিলা কলেজপাড়া এলাকায় মেসার্স মিতা-হাসান এন্টারপ্রাইজের ডিলার পয়েন্টে সকাল থেকে বিপুলসংখ্যক কৃষক সার নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করেন। একপর্যায়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে কয়েকজন গুদামের টিনের বেড়া ও দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন।

ডিলার মতিয়ার রহমান জানান, তাঁর গুদামে ৭৫০ বস্তা সার মজুত ছিল। প্রায় এক হাজার কৃষক একসঙ্গে সার নিতে লাইনে দাঁড়ানোয় চাপ তৈরি হয়। পরে পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে গুদামের সার কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।

রৌমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল আলম বসুনিয়া বলেন, উপজেলায় সারের সংকট নেই। কৃষকদের ধৈর্য ধরে পর্যায়ক্রমে সার উত্তোলনের আহ্বান জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে খোলাবাজারে সার বিক্রির ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহবুবুল হাসান বলেন, তিনি বিভিন্ন সার ডিলার পয়েন্ট পরিদর্শন করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। কৃষকেরা যাতে নিয়ম মেনে সার পান, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে কাজ করছে।

ভূরুঙ্গামারীর বঙ্গ সোনাহাট ইউনিয়নের ব্রিজপাড় এলাকায় সার বিতরণের স্লিপ দেওয়া নিয়ে সোমবার সকালে সাময়িক উত্তেজনা দেখা দেয়। কয়েকজন কৃষক বাঁশ ফেলে ও সড়কে আগুন জ্বালিয়ে ভূরুঙ্গামারী–সোনাহাট স্থলবন্দর সড়ক অবরোধ করেন।

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রকৃত কৃষকদের নিয়ম মেনে সার পাওয়ার আশ্বাস দিলে অবরোধ তুলে নেওয়া হয় এবং যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

বিএডিসি ডিলার মেসার্স আফি সার ঘরের আওতায় ২৩৫ বস্তা ডিএপি ও ৯৫ বস্তা টিএসপি সার বিতরণের জন্য স্লিপ দেওয়ার কার্যক্রম চলছিল। এ সময় কৃষকদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল জব্বার, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা হাবিব, ভূরুঙ্গামারী থানার ওসি মো. আজিম উদ্দিন, ইউএনও অমৃত দেব নাথ ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) আমিনুল হক তারেক ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন।

কুড়িগ্রাম জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাইয়েদ আহমেদ বাবু প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি ও অবৈধ মজুদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ডিলার পর্যায়ে সার বিতরণে আরও কঠোর মনিটরিংয়ের আহ্বান জানান।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, কুড়িগ্রামে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে। রোপা আমনের পাশাপাশি আগাম ভুট্টা, আলু ও বেগুন চাষের জন্য কিছু কৃষক অতিরিক্ত সার কিনে রাখার চেষ্টা করায় কোথাও কোথাও সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে। কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

কৃষি বিভাগ জানায়, রোপা আমন ধানে ইউরিয়া প্রয়োগের নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। তাই প্রয়োজনের অতিরিক্ত ইউরিয়া একসঙ্গে কেনা বা মজুত না করে চাহিদা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে সার কেনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসক অর্ণপূর্ণা দেবনাথ বলেন, কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তিনি গুজবে কান না দিয়ে কৃষকদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। কোনো ডিলার বা ব্যবসায়ী নিয়মের বাইরে সার বিক্রি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি কিংবা অবৈধভাবে সার মজুত করলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

 

এম সি এইচ
আরও পড়ুন