৯/১১ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শুরু হওয়া একের পর এক যুদ্ধের ২৫ বছর পেরিয়ে গেছে। আফগানিস্তান থেকে ইরাক, পাকিস্তান থেকে ইয়েমেন, সোমালিয়া, লিবিয়া ও সিরিয়া, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে পরিচালিত এসব সামরিক অভিযানে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪৫ লাখ মানুষ। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল-কায়েদার ১৯ সদস্য চারটি বাণিজ্যিক বিমান ছিনতাই করে নিউইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র ও পেন্টাগনে আঘাত হানে। এতে প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হন। এর এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে আফগানিস্তানে হামলা চালিয়ে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ শুরু করেন কথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’।
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের হিসাবে, ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধ ও সামরিক অভিযানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৪৫ থেকে ৪৭ লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের কারণে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষের। আর রোগ, অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত জটিলতায় পরোক্ষ মৃত্যুর সংখ্যা ৩৬ থেকে ৩৮ লাখ।
আফগানিস্তানে দুই দশকের যুদ্ধ
২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তানে অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তালেবান সরকারের পতন হলেও যুদ্ধ থামেনি। চার মার্কিন প্রেসিডেন্টের মেয়াদজুড়ে প্রায় ২০ বছর চলা এই সংঘাত হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের দীর্ঘতম যুদ্ধ।
কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের হিসাবে, আফগানিস্তানে সরাসরি যুদ্ধের কারণে প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। ক্ষুধা, রোগ ও চিকিৎসার অভাবে আরও কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যুদ্ধের আগে যেখানে আফগানিস্তানের ৬২ শতাংশ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন, যুদ্ধের পর সেই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৯২ শতাংশে।
২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর আবারও ক্ষমতা নেয় তালেবান। তবে যুদ্ধের রেখে যাওয়া ক্ষত এখনো শুকায়নি। অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ ও স্থলমাইন এখনো বেসামরিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে।
ইরাকে হামলা, হারিয়ে যাওয়া প্রজন্ম
২০০৩ সালের ১৯ মার্চ ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অভিযোগে চালানো সেই যুদ্ধের পর দেশটিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়।
যুদ্ধ শুরুর সময় ১৮ বছর বয়সী ছিলেন ওমর নামের এক ইরাকি তরুণ। বোমা হামলার শব্দ আর আতঙ্কের সেই দিনগুলোর কথা মনে করে তিনি বলেন, যুদ্ধের সময় কয়েকজন বন্ধু কী ঘটছে তা দেখতে বাইরে গিয়েছিলেন। তিনি তাদের যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু তারা আর ফিরে আসেননি।
কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের হিসাবে, ইরাক যুদ্ধে সরাসরি নিহত হয়েছেন প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার মানুষ। যুদ্ধের ধাক্কায় ভেঙে পড়ে দেশটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোও।
আকাশ থেকে যুদ্ধ, বাড়তে থাকে বেসামরিক প্রাণহানি
স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, আফগানিস্তান এবং ইরাক-সিরিয়ায় ব্যাপক বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
২০০৪ সাল থেকে ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের হিসাবে, পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৪২৩টি হামলায় ২ হাজার ৪৯৯ থেকে ৪ হাজার ১ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বেসামরিক মানুষের সংখ্যা ৪২৪ থেকে ৯৬৬। ইয়েমেনে অন্তত ১৮৬টি হামলা ও অভিযানে নিহত হয়েছেন অন্তত ৮৫৩ জন, যাদের মধ্যে অন্তত ১৫৮ জন বেসামরিক। সোমালিয়ায় ২০০১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ১৯ থেকে ২৩টি হামলায় নিহত হয়েছেন ১৮৮ থেকে ২৭৬ জন।
২০১১ সালে লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সময় বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার কথা বলে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর নেতৃত্বে বিমান অভিযান চালানো হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, সাত মাসে লিবিয়ায় প্রায় ৯ হাজার ৭০০টি হামলা চালানো হয়েছিল।
২০১৪ সালে ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসবিরোধী যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন অভিযানেও ব্যাপক বোমা হামলা চালানো হয়। ২০১৮ সাল পর্যন্ত মার্কিন কর্মকর্তারা ১ হাজার ৪১৭ বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করলেও এয়ারওয়ার্সের হিসাবে প্রকৃত সংখ্যা ৮ হাজার ২৬৪ থেকে ১৩ হাজার ৩৬০ হতে পারে।
ঘরহারা ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ
যুদ্ধের আরেকটি ভয়াবহ উত্তরাধিকার হলো বাস্তুচ্যুতি। কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের হিসাবে, আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, ফিলিপাইন, লিবিয়া ও সিরিয়ায় ২০০১-পরবর্তী যুদ্ধের কারণে দেশ ছাড়তে বা দেশের ভেতরে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ।
যুদ্ধ শেষ হলেও তাদের অনেকের ঘরে ফেরা হয়নি। গত বছরই ইরান ও পাকিস্তান থেকে প্রায় ২৯ লাখ আফগানকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের দুই দশক পরও ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন।
৪০ বছর বয়সী আফগান নারী আয়েশার জীবনও সেই দীর্ঘ বাস্তুচ্যুতির গল্প। ১৯৯৪ সালে প্রথম আফগানিস্তান ছেড়েছিলেন তিনি। ২০০০ সালে দেশে ফিরলেও ২০০২ সালে মার্কিন আগ্রাসনের পর আবার পালাতে হয়। এরপর ১১ বছর ইরানে কাটানোর পর সন্তানদের নিয়ে আবার আফগানিস্তানে ফিরতে বাধ্য হন।
যুদ্ধের ক্ষত মার্কিন সেনাদের শরীরেও
এই যুদ্ধের মূল্য শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের বেসামরিক মানুষকেই দিতে হয়নি। আফগানিস্তানে ৮ লাখের বেশি মার্কিন সেনা দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২১ সালে শেষ মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আগে সেখানে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা নিহত ও ২০ হাজার আহত হন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও মিত্র দেশগুলোর সামরিক সদস্য মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৫০০ এবং আহত ২৩ হাজার ৫০০-এর বেশি।
ইরাক যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের মধ্যে নিহত হয়েছেন ৩ হাজার ৪৮১ জন এবং আহত হয়েছেন ৩১ হাজারের বেশি।
তবে যুদ্ধের ক্ষত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের হিসাবে, ২০০১-পরবর্তী যুদ্ধে অংশ নেওয়া মার্কিন সাবেক সেনাদের চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবায় ২০৫০ সাল পর্যন্ত ২ দশমিক ২ থেকে ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। যুদ্ধ-পরবর্তী মানসিক আঘাত ও আত্মহত্যার ঘটনাও বড় উদ্বেগ হয়ে আছে।
৮ ট্রিলিয়ন ডলারের যুদ্ধ
দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা এসব যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়ও পৌঁছেছে বিপুল অঙ্কে। কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের হিসাবে, যুদ্ধ পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে প্রায় ৫ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। সাবেক সেনাদের ভবিষ্যৎ সেবার জন্য আরও ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের হিসাব ধরলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় অন্তত ৮ ট্রিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ ৯/১১ হামলার পর শুরু হওয়া ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ শুধু লাখ লাখ মানুষের জীবন কেড়ে নেয়নি; কোটি মানুষকে ঘরছাড়া করেছে, একটি প্রজন্মের জীবন বদলে দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও রেখে গেছে দীর্ঘমেয়াদি বোঝা।
২৫ বছর পরও সেই যুদ্ধের হিসাব শেষ হয়নি। আফগানিস্তান, ইরাক কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বোমার ক্ষত হয়তো ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে, কিন্তু নিহতদের পরিবার, বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবন এবং যুদ্ধফেরত সেনাদের মানসিক ক্ষত মনে করিয়ে দিচ্ছে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার ঘোষণা এলেই তার মানবিক মূল্য শেষ হয়ে যায় না। সূত্র: আলজাজিরা
ইরানবিরোধী প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চাপ স্পষ্ট: রেজাই
বাব আল-মান্দাব-এর নিয়ন্ত্রণ নিতে শতাধিক সেনা পাঠাচ্ছে ইরান
হুথি ইস্যু নিয়ে আরাঘচি-আসিম মুনির ফোনালাপ
পূর্ণ বিজয় না আসা পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে: নিকজাদ
একতরফাবাদ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ ব্রিকস: পেজেশকিয়ান
তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে ওয়াশিংটন ব্যর্থ: গালিবাফ