বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক এখন শুধু মহাকাশ, বৈদ্যুতিক গাড়ি কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে আলোচনায় নেই। যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতেও তাঁর উপস্থিতি ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’কে ব্যবহার করে তিনি অভিবাসন, জাতীয় পরিচয়, বহুসাংস্কৃতিক সমাজ ও ব্রিটিশ রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে ধারাবাহিকভাবে মত প্রকাশ করছেন। তাঁর কিছু বক্তব্য ও পোস্ট আবার যুক্তরাজ্যের ডানপন্থী রাজনীতির বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।
মাস্কের এই ভূমিকা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ব্রিটিশ রাজনীতি নিয়ে তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মকাণ্ডকে আলাদা করে বিশ্লেষণ করছেন সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের শিরোনামেই বলা হয়েছে, ব্রিটেনকে ঘিরে মাস্ক তাঁর ‘political chaos machine’ বা রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা তৈরির যন্ত্রকে সক্রিয় করেছেন। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি একটি নতুন অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক দলকে প্রচার করছেন এবং ‘গৃহযুদ্ধ অনিবার্য’—এমন বক্তব্য দিয়েছেন।
‘গৃহযুদ্ধ অনিবার্য’—কেন এমন বক্তব্য?
যুক্তরাজ্যে সামাজিক বিভাজন, অভিবাসন ও জাতিগত উত্তেজনা নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। ২০২৪ সালের দাঙ্গার পর থেকেই মাস্ক ব্রিটিশ পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে শুরু করেন। ২০২৬ সালেও তাঁর পোস্টে অভিবাসন ও জাতিগত রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে।
জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে দ্য গার্ডিয়ান জানায়, ৩১ মে থেকে ১২ জুন পর্যন্ত মাস্কের এক্স পোস্ট, রিপ্লাই ও রিপোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে—তিনি যুক্তরাজ্যের জাতি ও অভিবাসন-সংক্রান্ত বিষয়ে ৩০৩টি পোস্ট করেছেন। এর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ছিল ব্রিটিশ রাজনীতিকে কেন্দ্র করে। একই সময়ে তাঁর নিজের মহাকাশ প্রতিষ্ঠান SpaceX নিয়ে পোস্ট ছিল ১১৪টি।
এ থেকে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট—যুক্তরাজ্যের রাজনীতি তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সাময়িক কোনো বিচ্যুতি নয়; এটি একটি ধারাবাহিক আগ্রহে পরিণত হয়েছে।
নতুন দলের পাশে মাস্ক
এই রাজনৈতিক সক্রিয়তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো Restore Britain। দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক Reform UK এমপি রুপার্ট লো। দলটি অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, গণ-প্রত্যাবাসনসহ কঠোর ডানপন্থী নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
মাস্ক প্রকাশ্যে লোকে সমর্থন করেছেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি এক্সে লোকে Restore Britain-এ যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাস্কের সমর্থন লোর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অনলাইন উপস্থিতিকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
মে মাসের একটি উপনির্বাচনকে ঘিরেও Reform UK ও Restore Britain-এর মধ্যে প্রকাশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়। গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মাস্কের সমর্থন এই দুই ডানপন্থী দলের দ্বন্দ্বকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও দৃশ্যমান করে তোলে।
এক্সই প্রধান অস্ত্র
মাস্কের রাজনৈতিক প্রভাবের সবচেয়ে বড় মাধ্যম তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্স। প্রচলিত রাজনৈতিক প্রচারে যেখানে দলকে বিজ্ঞাপন, সভা, সংবাদমাধ্যম ও সংগঠনের ওপর নির্ভর করতে হয়, সেখানে মাস্ক কয়েক কোটি ব্যবহারকারীর কাছে সরাসরি বার্তা পৌঁছাতে পারেন।
এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন।
কোনো রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য ভাইরাল করতে তাঁর নিজের দলীয় সংগঠন প্রয়োজন হয় না; একজন প্রভাবশালী ব্যবহারকারীর পুনঃপ্রচারই সেটিকে মুহূর্তে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিয়ে আসতে পারে। মাস্কের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি একই সঙ্গে প্ল্যাটফর্মটির মালিক এবং বিশ্বের অন্যতম পরিচিত প্রযুক্তি উদ্যোক্তা।
রুপার্ট লোর ক্ষেত্রেও এমন প্রভাব দেখা গেছে। গার্ডিয়ান জানিয়েছে, এক্সে লোর পোস্টগুলো থেকে তিনি উল্লেখযোগ্য আয় করেছেন এবং তাঁর কিছু পোস্টে লাখ লাখ মানুষের সম্পৃক্ততা তৈরি হয়েছে। মাস্ক নিজেও লোর কিছু বক্তব্য পুনরায় প্রচার করেছেন।
অভিবাসন থেকে ‘সভ্যতা’ রক্ষার প্রশ্ন
মাস্কের ব্রিটিশ রাজনৈতিক বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে অভিবাসন ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজ নিয়ে তাঁর উদ্বেগ। তিনি বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছেন, পশ্চিমা সমাজের প্রচলিত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামো হুমকির মুখে।
এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘সভ্যতা ভেঙে পড়লে অন্য কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়।’ আবার ব্রিটেনে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সংঘাত নিয়েও তিনি মন্তব্য করেছেন। গার্ডিয়ানের জুলাইয়ের প্রতিবেদনে তাঁর এমন বক্তব্যের কথা উল্লেখ করা হয় যে, আগামী দুই দশকের মধ্যে যুক্তরাজ্য গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে এসব বক্তব্যকে ভবিষ্যতের নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে দেখা যায় না। ব্রিটিশ সমাজে বিভাজন ও সহিংসতার ঝুঁকি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও ‘গৃহযুদ্ধ অনিবার্য’—এটি মূলত মাস্কের রাজনৈতিক পূর্বাভাস ও মতামত।
বাস্তব রাজনীতি বনাম অনলাইন উত্তেজনা
এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ভাষা কি বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে?
যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে ইতোমধ্যে Reform UK-এর মতো ডানপন্থী দল শক্তিশালী উপস্থিতি তৈরি করেছে। পাশাপাশি Restore Britain-এর মতো আরও কঠোর অভিবাসনবিরোধী প্ল্যাটফর্মও নিজেদের জায়গা তৈরির চেষ্টা করছে। অর্থাৎ মাস্ক যে রাজনৈতিক বক্তব্যগুলো সামনে আনছেন, সেগুলোর কিছু বিষয় ব্রিটিশ সমাজে আগে থেকেই রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ।
তবে মাস্কের ভূমিকা হলো সেই বিতর্ককে তাঁর বিপুল অনলাইন দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া। ফলে তাঁর বক্তব্য কেবল ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে থেমে থাকে না; তা রাজনৈতিক প্রচারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমিক বিস্তার এবং জনমতের আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে।
অর্থ ও প্রভাবের নতুন সমীকরণ
ব্রিটিশ রাজনীতিতে বড় অর্থের প্রভাব নিয়েও বর্তমানে আলোচনা চলছে। সেপ্টেম্বরেই Reform UK দুই ক্রিপ্টো বিলিয়নিয়ার—বেন ডেলো ও ক্রিস্টোফার হারবোর্নের কাছ থেকে মোট ৭২ মিলিয়ন পাউন্ড অনুদান পাওয়ার কথা জানিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে দলীয় অর্থায়ন ও ধনী ব্যক্তিদের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
Restore Britain-ও সম্প্রতি ৫ লাখ পাউন্ডের একটি বড় অনুদান পেয়েছে। অর্থাৎ ব্রিটিশ রাজনীতির ডানদিকে শুধু ভোটের প্রতিযোগিতাই নয়, অর্থ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক বার্তা—তিনটির সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা কোথায়?
ইলন মাস্কের ব্রিটিশ রাজনীতিতে সক্রিয়তা একটি বড় পরিবর্তনের প্রতীক—রাজনৈতিক প্রভাব আর শুধু সংসদ, দলীয় কার্যালয় বা সংবাদমাধ্যমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মালিক এবং বিপুল সংখ্যক অনুসারী থাকা একজন ব্যক্তি সরাসরি রাজনৈতিক বিতর্কের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারেন।
তবে তাঁর বক্তব্যের প্রভাব কতটা ভোটে রূপান্তরিত হবে, আর কতটা কেবল অনলাইন উত্তেজনা তৈরি করবে—তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না।
যা স্পষ্ট, তা হলো ব্রিটেনে অভিবাসন, জাতীয় পরিচয় ও সামাজিক বিভাজন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে মাস্ক একটি শক্তিশালী অনলাইন কণ্ঠ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁর সমর্থন Restore Britain-এর মতো দলের প্রচারে নতুন দৃশ্যমানতা দিয়েছে। একই সঙ্গে ‘গৃহযুদ্ধ’ নিয়ে তাঁর বক্তব্য রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও উত্তপ্ত করেছে।
ফলে ব্রিটিশ রাজনীতিতে এখন নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—ভবিষ্যতের রাজনৈতিক লড়াই কি শুধু ব্যালট বাক্সে হবে, নাকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও সেই লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ময়দান হয়ে উঠবে?
‘গাজায় প্রায় ২ হাজার ভবন ধসের ঝুঁকিতে’
ইয়েমেনে সহিংসতায় এক লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত: জাতিসংঘ
সুন্নি আলেম হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার ভাহিদির
পুরোনো এফ-৫ দিয়ে যেভাবে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিলো ইরানিরা