বিমানঘাঁটির ঘটনায় আইআরজিসির সংশ্লিষ্টতা ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ তত্ত্ব: ইরান

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৮ এএম

যুক্তরাজ্যের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটির কাছে সন্দেহজনক নাশকতার পরিকল্পনায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ সরকার বলছে, ঘটনাটি ইরান থেকে সমন্বিত হয়ে থাকতে পারে এবং এর পেছনে আইআরজিসির ভূমিকা থাকার সম্ভাবনা প্রবল। তবে তেহরান এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে একে ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ বা অন্যের ওপর দায় চাপানোর উদ্দেশ্যে সাজানো ঘটনা বলে দাবি করেছে।

এ নিয়ে যুক্তরাজ্য ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, ঘটনাটির পেছনে প্রকৃতপক্ষে কারা ছিল এবং প্রকাশ্যে আসা তথ্যের ভিত্তিতে কতটা নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব। তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে ইরানের সংশ্লিষ্টতা কিংবা তেহরানের উত্থাপিত ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ তত্ত্ব, কোনোটিকেই চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত বলা যাচ্ছে না। 

কী ঘটেছিল ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটির কাছে?
ব্রিটেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় গ্লুচেস্টারশায়ারে অবস্থিত আরএএফ ফেয়ারফোর্ড যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমান ব্যবহারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘাঁটি। ২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ভোরে ঘাঁটিটির কাছে সন্দেহজনক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পর পাঁচ ব্রিটিশ নাগরিককে সন্ত্রাসবাদ ও বিস্ফোরক-সংক্রান্ত অপরাধের সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সন্দেহভাজনদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি ভ্যানে পেট্রোল পাওয়া গিয়েছিল, তবে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। পরে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন না করেই কঠোর শর্তে পুলিশি জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হলে তাদেরও পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। ঘটনাটির প্রকৃতি, সম্ভাব্য লক্ষ্য এবং এর সঙ্গে বিদেশি কোনো রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।

ব্রিটেনের অভিযোগে আইআরজিসির নাম
১২ অক্টোবর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম পার্লামেন্টে বলেন, ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটির কাছে সন্দেহভাজন পরিকল্পনাটি ইরান থেকে সমন্বিত হয়ে থাকার সম্ভাবনা ‘খুব বেশি’ এবং এটি প্রায় নিশ্চিতভাবেই আইআরজিসির নির্দেশনায় পরিচালিত হয়েছিল বলে ব্রিটিশ সরকারের মূল্যায়ন। ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদও জানান, তদন্তকারীরা সন্দেহভাজন সমন্বয়কারী হিসেবে ইরানে অবস্থানরত একজন পরিচিত ব্যক্তিকে শনাক্ত করেছেন। তবে তার নাম এবং এ মূল্যায়নের পক্ষে ব্যবহৃত গোয়েন্দা তথ্যের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।

এ ঘটনার পর যুক্তরাজ্য ইরানের দুই নাগরিকের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। তাদের একজন আইআরজিসির পাল্টা গোয়েন্দা কার্যক্রমের প্রধান রুহুল্লাহ বাজঘান্দি। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে ইরানি রাষ্ট্রের পক্ষে বৈরী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা বা তা সহজ করার অভিযোগ এনেছে। তবে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা দুজনকে ফেয়ারফোর্ডের ঘটনার সরাসরি সংগঠক হিসেবে স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা হয়নি।

ইরানের পাল্টা বক্তব্য: ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অপারেশন
ব্রিটিশ অভিযোগের জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তেহরানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, পর্যাপ্ত প্রমাণ প্রকাশ না করে ‘অত্যন্ত সম্ভাব্য’ বা ‘প্রায় নিশ্চিত’ ধরনের শব্দ ব্যবহার করে ইরানকে দায়ী করা হচ্ছে। ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অভিযোগ পশ্চিমা দেশগুলোর ইরানবিরোধী প্রচারণা জোরদার এবং যুক্তরাজ্যের সামরিক অবস্থানের বিষয়ে সমালোচনা থেকে মনোযোগ সরানোর প্রচেষ্টার অংশ। তেহরান ঘটনাটিকে ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অপারেশন হিসেবে অভিহিত করেছে।

‘ফলস ফ্ল্যাগ’ বলতে সাধারণত এমন কোনো গোপন অভিযান বা হামলাকে বোঝায়, যেখানে প্রকৃত পরিকল্পনাকারী নিজের পরিচয় আড়াল করে অন্য কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রকে দায়ী করার পরিস্থিতি তৈরি করে। এর মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করা, প্রতিপক্ষকে বিচ্ছিন্ন করা কিংবা সামরিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা হতে পারে। তবে কোনো ঘটনা ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ কি-না, তা নির্ধারণের জন্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। শুধু কোনো রাষ্ট্রের অভিযোগ বা অস্বীকারের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। 

কেন ঘটনাটি ঘিরে সন্দেহ ও বিতর্ক?
ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর এই ঘাঁটির কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ফলে ঘাঁটিটির নিরাপত্তা নিয়ে যেকোনো ঘটনা বৃহত্তর সংঘাতের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক গুরুত্ব পাচ্ছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার পর নিরাপত্তাঝুঁকির আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র ফেয়ারফোর্ড থেকে প্রায় এক ডজন বি-১ বোমারু বিমান সরিয়ে নেয়। কিছু মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে ছোট ড্রোন হামলার আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছিল। তবে এসব তথ্য থেকে সন্দেহভাজন পরিকল্পনার প্রকৃত উদ্দেশ্য বা দায়ী পক্ষ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। 

এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, তার সরকার ব্রিটেনকে সম্ভাব্য ইরানি-সমর্থিত হামলার বিষয়ে আগাম গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছিল। এ বক্তব্যও ঘটনাটির রাজনৈতিক মাত্রা বাড়িয়েছে। তবে প্রকাশ্যে আসা তথ্যের ভিত্তিতে ইসরায়েলের দেওয়া সতর্কবার্তার প্রকৃতি কিংবা তার সঙ্গে পরবর্তী তদন্তের সম্পর্ক পুরোপুরি যাচাই করা সম্ভব নয়।

অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, প্রমাণের অপেক্ষা
ঘটনাটি নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের অবস্থান হলো, ইরান-সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তাদের ভূখণ্ডে বৈরী কর্মকাণ্ড পরিচালনার ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে। অন্যদিকে ইরান বলছে, প্রমাণহীন অভিযোগের মাধ্যমে দেশটিকে আন্তর্জাতিকভাবে হুমকি হিসেবে তুলে ধরে সামরিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। প্রথমত, ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটির কাছে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত একটি ঘটনা ঘটেছে এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল; এটি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বর্ণিত তথ্য। দ্বিতীয়ত, ওই ঘটনার সঙ্গে ইরান বা আইআরজিসির সংশ্লিষ্টতা এবং ঘটনাটি ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ ছিল কি-না, এগুলো নিয়ে পরস্পরবিরোধী দাবি রয়েছে।

সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন, তদন্তের পূর্ণাঙ্গ ফল, গোয়েন্দা তথ্যের নির্ভরযোগ্য অংশ প্রকাশ এবং আদালতে প্রমাণ উপস্থাপন ছাড়া এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি কঠিন। তাই ফেয়ারফোর্ডের ঘটনাটি আপাতত শুধু নিরাপত্তা-সংকট নয়; এটি ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে আস্থার ঘাটতি, গোয়েন্দা তথ্যের গোপনীয়তা এবং সংঘাতকালীন তথ্যযুদ্ধেরও একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

জেএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত