কোন কোন সময়ে ঘুমানো উচিত নয়, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান কী বলছে?

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৫৯ পিএম

দিনের যেকোনো সময় ঘুমানো কি শরীরের জন্য ক্ষতিকর? দুপুরে, বিকেলে কিংবা খাবার খাওয়ার পর ঘুমালে কি সত্যিই নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ে? আবার রাত জেগে দিনের বেলায় ঘুমানোর অভ্যাস কতটা বিপজ্জনক? এসব বিষয়ে প্রচলিত ধারণার পাশাপাশি চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যাখ্যাও জানা জরুরি।

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন- স্বাস্থ্যবিজ্ঞানে সবার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়কে ঘুমানোর সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ সময় বলা হয়নি। বরং ঘুমের সময়, স্থায়িত্ব, নিয়মিততা এবং ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর এর প্রভাবই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে কিছু সময়ে বা কিছু পরিস্থিতিতে ঘুমের অভ্যাস স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

যে সময়গুলোতে ঘুমের অভ্যাস এড়িয়ে চলা ভালো

১. বিকেল ৩টার পর দীর্ঘ সময় ঘুমানো : দুপুরে অল্প সময়ের ঘুম ক্লান্তি কমাতে এবং সতর্কতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু বিকেলের শেষ ভাগে বা সন্ধ্যার দিকে দীর্ঘ সময় ঘুমালে রাতে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে। বিশেষ করে যাদের অনিদ্রা বা রাতে ঘুমের সমস্যা রয়েছে, তাদের দিনের ঘুম সীমিত রাখা প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হার্ট, লাং অ্যান্ড ব্লাড ইনস্টিটিউট (NHLBI) দিনের ঘুম প্রয়োজন হলে তা দুপুরের প্রথম ভাগে নেওয়ার পরামর্শ দেয়। তাদের নির্দেশনায় প্রাপ্তবয়স্কদের ঘুম ২০ মিনিটের বেশি না রাখার কথাও বলা হয়েছে। NIH-এর স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দেশনায় বিকেল ৩টার পর ঘুম না নেওয়ার পরামর্শ রয়েছে। 

২. রাতের খাবার খেয়েই ঘুমিয়ে পড়া : রাতে ভারী খাবার খেয়ে সঙ্গে সঙ্গে বিছানায় যাওয়ার অভ্যাস ভালো নয়। এতে বদহজম, বুকজ্বালা বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা বাড়তে পারে। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটির সমস্যা রয়েছে, তাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন এজিং (NIA) ঘুমানোর দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে বড় খাবার খাওয়া এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। NHLBI-ও ঘুমের কয়েক ঘণ্টা আগে ভারী খাবার না খাওয়ার কথা বলেছে। 

৩. প্রতিদিন গভীর রাতে ঘুমাতে যাওয়া : প্রতিদিন রাত জেগে দেরিতে ঘুমানো এবং সকালে দেরিতে ওঠার অভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণের ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। বিশেষ করে সপ্তাহের কর্মদিবস ও ছুটির দিনে ঘুমের সময়ের বড় পার্থক্য থাকলে শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবঘড়ি বিঘ্নিত হতে পারে। তাই প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। NHLBI সপ্তাহের দিন ও ছুটির দিনের ঘুমের সময়ের পার্থক্য প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে রাখার পরামর্শ দিয়েছে। 

৪. সন্ধ্যা বা রাতের শুরুতে দীর্ঘ ঘুম : কাজের ক্লান্তিতে সন্ধ্যায় ঘুমিয়ে পড়লে অনেক সময় রাতের স্বাভাবিক ঘুমের সময় পিছিয়ে যায়। কেউ কেউ সন্ধ্যায় কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে রাতের বড় অংশ জেগে কাটান। নিয়মিত এমন হলে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে যাদের রাতে ঘুম আসতে সমস্যা হয়, তাদের সন্ধ্যার ঘুম এড়িয়ে চলা ভালো। তবে রাতের পালায় কাজ করেন বা শিফট ডিউটি করেন, তাদের ক্ষেত্রে ঘুমের সময় আলাদা হতে পারে। তাদের পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করাই প্রধান বিষয়। 

৫. অতিরিক্ত রাতের খাবার বা পানীয় গ্রহণের পর ঘুম : ঘুমানোর ঠিক আগে অতিরিক্ত খাবার বা প্রচুর তরল পান করলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। ভারী খাবারে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে, আবার রাতে বেশি পানি পান করলে বারবার প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভেঙে যেতে পারে। এ কারণে ঘুমের আগে খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা এবং অতিরিক্ত পানীয় গ্রহণ না করার পরামর্শ দিয়েছে NIH।

৬. ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে গাড়ি চালানো বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করা : এটি ঘুমানোর সময়সংক্রান্ত বিষয় না হলেও ঘুমের অভাবের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও প্রতিক্রিয়ার গতি কমে যেতে পারে। ফলে গাড়ি চালানো বা যন্ত্রপাতি পরিচালনার সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান একাডেমি অব স্লিপ মেডিসিনের (AASM) মতে, নিয়মিত সাত ঘণ্টার কম ঘুম প্রাপ্তবয়স্কদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এর সঙ্গে কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। 

তাহলে ঘুমানোর সবচেয়ে ভালো সময় কখন?

ঘুমানোর নির্দিষ্ট সময় সবার জন্য এক নয়। বয়স, কাজের ধরন, শারীরিক অবস্থা এবং দৈনন্দিন রুটিনের ওপর এটি নির্ভর করে। তবে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


বয়স অনুযায়ী দৈনিক ঘুমের প্রয়োজন

বয়স                     প্রয়োজনীয় ঘুম
১৩-১৭ বছর            ৮-১০ ঘণ্টা
১৮-৬০ বছর           কমপক্ষে ৭ ঘণ্টা
৬১-৬৪ বছর           ৭-৯ ঘণ্টা
৬৫ বছর বা বেশি    ৭-৮ ঘণ্টা

প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে রাতের ঘুম নিয়মিত সাত ঘণ্টা বা তার বেশি হওয়া উচিত। তবে শুধু ঘুমের পরিমাণ নয়, ঘুমের মান ও নিয়মিততাও গুরুত্বপূর্ণ। 

আসরের পর বা মাগরিবের আগে ঘুমানো কি নিষেধ?

আমাদের সমাজে আসরের পর, মাগরিবের আগে কিংবা সন্ধ্যার সময় ঘুমানো নিয়ে নানা প্রচলিত ধারণা রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, এসব সময়ে ঘুমালে শরীরের ক্ষতি হয়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্ভরযোগ্য নির্দেশনায় আসরের পর বা মাগরিবের আগে ঘুমানোকে সবার জন্য ক্ষতিকর বা নিষিদ্ধ বলা হয়নি। এখানে মূল বিষয় হলো, ওই সময়ের ঘুম রাতের স্বাভাবিক ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে কি-না। ধর্মীয় বিধান বা সামাজিক বিশ্বাসের বিষয়টি আলাদা; চিকিৎসাবিজ্ঞানের বক্তব্য দিয়ে ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা নির্ধারণ করা যায় না।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও যদি নিয়মিত ক্লান্তি থাকে, দিনের বেলায় অস্বাভাবিক ঘুম পায়, রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায় কিংবা ঘুমের মধ্যে জোরে নাক ডাকা ও শ্বাস আটকে আসার মতো সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। দীর্ঘদিনের ঘুমের সমস্যা অবহেলা করা ঠিক নয়। 

ঘুমের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর বিষয় শুধু নির্দিষ্ট কোনো সময় নয়; বরং অনিয়মিত ঘুম, অপর্যাপ্ত ঘুম এবং ভুল সময়ে দীর্ঘক্ষণ ঘুমানোর অভ্যাস। বিকেল বা সন্ধ্যায় দীর্ঘ ঘুম, রাতের খাবার খেয়েই বিছানায় যাওয়া এবং প্রতিদিন ঘুমের সময় পরিবর্তন করা এড়িয়ে চলা ভালো। শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত জীবনযাপনই সুস্থ থাকার অন্যতম শর্ত।

জেএম
আরও পড়ুন