ধুরুং খালের ভাঙনে বিলীনের পথে মানিকপুর, ঝুঁকিতে সেতু-সড়ক

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৬, ০২:৩৭ পিএম

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের মানিকপুর আটারোটিলা বটতলা এলাকায় ধুরুং খালের ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বাইন্যাছোলা সেতুর দক্ষিণ পাশে অব্যাহত ভাঙনে ইতোমধ্যে বিলীন হয়েছে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি ও বেশ কয়েকটি দোকান। বর্তমানে ভাঙন সড়কের একেবারে কাছাকাছি চলে আসায় হুমকির মুখে পড়েছে ফটিকছড়ি-লক্ষীছড়ি আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া না হলে যেকোনো সময় সড়কটি ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে ঝুঁকিতে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বাইন্যাছোলা সেতুও।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে ধুরুং খালের ভাঙন ধাপে ধাপে বাড়ছে। এরই মধ্যে অন্তত ২০ কানি কৃষিজমি ও চারটি দোকান খালের গর্ভে বিলীন হয়েছে। একসময় সড়ক থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে থাকা খালটি ভাঙতে ভাঙতে এখন সড়কের একেবারে কাছে চলে এসেছে। আর প্রায় ৫০ মিটার ভাঙন হলে সড়কটি সরাসরি খালের ভাঙনের কবলে পড়তে পারে।

ভাঙনকবলিত এলাকার আশপাশে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস। আজাদীপাড়া ও আটারোটিলা এলাকার অন্তত ৮০টি পরিবার সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ফটিকছড়ির সঙ্গে খাগড়াছড়ির লক্ষীছড়ি উপজেলার সড়ক যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল গনী বাদশা বলেন, ‘আমাদের বাঁচান, কৃষকদের বাঁচান। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আমরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ব। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানিয়েছি।’

আব্দুল হালিম বলেন, ‘একসময় এখানে পুরোনো চমুরহাট এলাকা ছিল। সেখানে অনেক দোকানপাট ছিল। ইতোমধ্যে প্রায় পাঁচ বিঘা জমি খালের গর্ভে চলে গেছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে আরও প্রায় ১০ বিঘা জমি বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

কৃষক সোলাইমান ও শফিউল আলম জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে ছোট পরিসরে ভাঙন শুরু হয়েছিল। প্রতি বর্ষায় পাহাড়ি ঢলের পানির স্রোতে ভাঙনের তীব্রতা বাড়তে বাড়তে এখন তা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ইতোমধ্যে অনেক কৃষক তাদের আবাদি জমি হারিয়েছেন। ফলে একদিকে কমছে কৃষিজমি, অন্যদিকে জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।

স্থানীয় ইউপি সদস্য রমজান আলী বলেন, ‘একসময় ধুরুং খালটি সড়ক থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে ছিল। বছরের পর বছর ভাঙতে ভাঙতে এখন এটি রাস্তার পাশ পর্যন্ত চলে এসেছে। আমার নিজেরও তিন কানি কৃষিজমি ও একটি দোকান খালের গর্ভে বিলীন হয়েছে। কৃষকদের রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করতে হবে।’

স্থানীয় বাসিন্দা কপিল উদ্দীন বলেন, ভাঙনের বর্তমান গতি অব্যাহত থাকলে আর কিছুদিনের মধ্যেই সড়কের অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তখন শুধু কয়েকটি পরিবার নয়, পুরো এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়বে।

কাঞ্চননগর ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি মুজাম্মেল হক তালুকদার বলেন, ফটিকছড়ি ও লক্ষীছড়ির মধ্যে যোগাযোগের জন্য সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগে ধুরুং খালটি উত্তর পাশে ছিল। কিন্তু পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোত এখন এপাশে আঘাত করায় ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। কৃষিজমি ও সড়ক রক্ষায় দ্রুত স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

এদিকে স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ‘ধুরুং নদীর ভাঙনকবলিত এলাকার বিষয়ে একটি প্রতিবেদন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী সোহাগ তালুকদার বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধি ও সার্ভেয়ার দল ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছে। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত অংশের পরিমাপও সম্পন্ন করা হয়েছে। মানিকপুর এলাকায় ধুরুং নদীর প্রায় ১৩০ মিটার ঝুঁকিপূর্ণ অংশ মেরামতের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ চাওয়া হবে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন অব্যাহত থাকলেও এখনো স্থায়ীভাবে ভাঙন ঠেকানোর কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। প্রতি বর্ষায় নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। তাদের দাবি, সাময়িক সংস্কারের বদলে দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধ ও নদীশাসনের ব্যবস্থা নিতে হবে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, এখনই ব্যবস্থা না নিলে ধুরুং খালের ভাঙনে শুধু কৃষিজমি ও দোকানপাট নয়, বসতবাড়ি, বাইন্যাছোলা সেতু এবং ফটিকছড়ি-লক্ষীছড়ি সড়কও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে কয়েক হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা ও গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বড় ধরনের সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

MCH/YA
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত