কালীগঞ্জের মেয়ে তাজরা সাবের এখন যুক্তরাজ্যের চিকিৎসক

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫১ পিএম

কোনো সাফল্য শুধু একজন মানুষের হয় না। একটি অর্জনের পেছনে জড়িয়ে থাকে বাবা-মায়ের ত্যাগ, শিক্ষকদের প্রেরণা, অসংখ্য নির্ঘুম রাত আর অদম্য অধ্যবসায়ের গল্প। আর সেই অর্জন যখন বিশ্বমঞ্চে দেশের মুখ উজ্জ্বল করে, তখন তা হয়ে ওঠে একটি জনপদের গর্ব, একটি প্রজন্মের অনুপ্রেরণা। গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার চৌড়া ভাদগাতী গ্রামের তাজরা সাবেরের গল্পও ঠিক তেমনই স্বপ্ন, সংগ্রাম আর সাফল্যের এক অনন্য উপাখ্যান।

দীর্ঘ অধ্যবসায়, কঠোর পরিশ্রম এবং লক্ষ্যপূরণে অবিচল থাকার প্রতিদান হিসেবে তাজরা সাবের যুক্তরাজ্যের বিশ্বখ্যাত গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে সাফল্যের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। শিক্ষাজীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অতিক্রম করার আগেই তার পেশাজীবনের নতুন দুয়ারও খুলে গেছে। যুক্তরাজ্যের ফোর্থ ভ্যালি রয়্যাল হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে তার নিয়োগ নিশ্চিত হয়েছে। আগামী ২৭ জুলাই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।

তাজরা সাবের গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার চৌড়া ভাদগাতী গ্রামের বাসিন্দা আইয়ুব সাবের টিপু ও বাকিয়া চৌধুরী লতার একমাত্র কন্যা। ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন লালন করতেন তিনি। সেই স্বপ্ন পূরণের পথে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন, শিক্ষকদের আন্তরিক দিকনির্দেশনা এবং নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি।

উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমানোর পর তার সামনে আসে সম্পূর্ণ নতুন এক বাস্তবতা। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি, কঠিন শিক্ষাব্যবস্থা এবং বিশ্বমানের প্রতিযোগিতার মধ্যেও তিনি কখনো লক্ষ্যচ্যুত হননি। বরং প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে তিনি নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। দিনের পর দিন কঠোর অধ্যয়ন, হাসপাতালের প্রশিক্ষণ, অসংখ্য পরীক্ষা এবং নিরলস পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন দক্ষ চিকিৎসক হিসেবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের দিনটি ছিল তাজরার জীবনের এক স্মরণীয় অধ্যায়। হাতে চিকিৎসক হওয়ার সনদ তুলে নেওয়ার সেই মুহূর্ত শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; সেটি ছিল বাবা-মায়ের বছরের পর বছর ধরে লালন করা স্বপ্নের বাস্তবায়ন, একটি পরিবারের ত্যাগের স্বীকৃতি এবং একটি গ্রামের আনন্দের দিন।

শিক্ষাজীবনের গণ্ডি পেরিয়ে এবার পেশাজীবনের নতুন দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন তাজরা। আগামী ২৭ জুলাই থেকে যুক্তরাজ্যের ফোর্থ ভ্যালি রয়্যাল হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করবেন তিনি। মানুষের জীবন রক্ষা এবং চিকিৎসাসেবার মতো মহৎ দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই শুরু হবে তাঁর নতুন পথচলা।

বাবা মায়ের সাথে চিকিৎসক তাজরা সাবের

তবে তাজরার স্বপ্ন কেবল বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়া নয়। তার বিশ্বাস, চিকিৎসকের সবচেয়ে বড় পরিচয় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। তাই ভবিষ্যতে সুযোগ পেলেই তিনি দেশের অসহায়, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিতে চান। দেশের মানুষের কল্যাণে নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ইচ্ছাই তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অন্যতম অংশ।

তার এই অর্জনের খবরে আনন্দে উদ্বেল পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং চৌড়া ভাদগাতী গ্রামের মানুষ। স্থানীয়দের ভাষায়, তাজরা শুধু নিজের পরিবারের মুখই উজ্জ্বল করেননি; তিনি কালীগঞ্জের নামও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মানের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। তার এই সাফল্য এলাকার অসংখ্য শিক্ষার্থীর কাছে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস জোগাবে বলেও মনে করছেন তারা।

তাজরা সাবেরের এই পথচলা প্রমাণ করে, সাফল্যের পেছনে কোনো শর্টকাট নেই। থাকে অবিরাম পরিশ্রম, ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস এবং লক্ষ্যপূরণের অদম্য ইচ্ছা। চৌড়া ভাদগাতী গ্রামের একটি সাধারণ পরিবার থেকে শুরু হওয়া তার যাত্রা আজ পৌঁছেছে যুক্তরাজ্যের চিকিৎসা অঙ্গনে। তার এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত নয়—এটি কালীগঞ্জের গর্ব, গাজীপুরের গর্ব এবং বাংলাদেশের জন্যও এক অনুপ্রেরণার গল্প।

MCH/AHA
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত