ড্রোনে নজরদারি তবু সুন্দরবনে কমছে না অপরাধ

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২৬, ১০:৩৫ পিএম

বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সুন্দরবন রক্ষায় গত তিন বছরে পশ্চিম বন বিভাগ ২৩ হাজার ৪টি অভিযান পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে ৮৭৮ জনকে আটক, ১ হাজার ৩৭৩টি মামলা এবং বিপুল পরিমাণ হরিণের মাংস, বিষ, মাছ, কাঁকড়া, কাঠ ও নৌকা জব্দ করা হলেও বন অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বন বিভাগের তথ্যে যেমন সাফল্যের চিত্র উঠে এসেছে, তেমনি জনবল সংকট, সরঞ্জামের অভাব ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ধীরগতিও স্পষ্ট হয়েছে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে ৩৫১টি মামলায় চার্জশিট দেওয়া হলেও দণ্ডিত হয়েছেন মাত্র ১১২ জন। অর্থাৎ অধিকাংশ মামলার বিচার এখনো শেষ হয়নি। ফলে বন অপরাধ দমনে অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন পরিবেশবিদরা।

একই সময়ে বন বিভাগের অভিযানে জব্দ করা হয়েছে ২ হাজার ১৬ দশমিক ৭০ কেজি হরিণের মাংস, ২৯০ বোতল বিষ, ৮ হাজার ৫৭১ দশমিক ৫০ কেজি মাছ, ১১ হাজার ১১৫ কেজি কাঁকড়া, ৯০৩ দশমিক ৯২ ঘনফুট কাঠ এবং ১ হাজার ৭৭৩টি নৌকা। এছাড়া হরিণ শিকারসংক্রান্ত ১৯৪টি মামলা এবং বাঘ, কচ্ছপ, সাপ, শুকর, শামুক ও শাপলা পাচারসংক্রান্ত আরও একাধিক মামলা হয়েছে।

বন বিভাগের তথ্য বলছে, খুলনা রেঞ্জের কালাবগী, পাশাখালী, আড়াচাই, ঝিঙা চুল, নলিয়ান, বানিয়াখালী, কাশিয়াবাদসহ কয়েকটি এলাকায় এবং সাতক্ষীরা রেঞ্জের বিভিন্ন অংশে এখনো বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের প্রবণতা বেশি। নিয়মিত অভিযান চললেও এই অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

সুন্দরবনের মতো বিশাল বনাঞ্চল রক্ষায় সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে জনবল সংকট। পশ্চিম বন বিভাগে অনুমোদিত পদ ৬৪৪টি হলেও কর্মরত আছেন মাত্র ৪২৩ জন। শূন্য রয়েছে ২২১টি পদ।

শুধু জনবল নয়, প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও সরঞ্জামেও ঘাটতি রয়েছে। অতিরিক্ত ১২টি চাইনিজ রাইফেল, ৪৫টি শর্টগান, ২৪টি সিক্স শুটার ও ৬টি ট্রাঙ্কুলাইজার গান প্রয়োজন বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

বন বিভাগের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে প্রায় ৪ কোটি ২৫ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। মাছ ও গোলপাতা থেকে আয় কমলেও কাঁকড়া থেকে রাজস্ব কিছুটা বেড়েছে।

উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের জেলে মোজাফফর বলেন, আগের তুলনায় বন বিভাগের টহল অনেক বেড়েছে। এখন প্রায় প্রতিদিনই নদী-খাল এলাকায় বনরক্ষীদের দেখা যায়। ড্রোন ব্যবহার করতেও দেখেছি। তবে এখনও কিছু অসাধু চক্র গোপনে বিষ দিয়ে মাছ ধরার চেষ্টা করে। নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকলে এসব অপরাধ আরও কমবে বলে আশা করি।

উপজেলার সদর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লুতফর রহমান বলেন, সুন্দরবন রক্ষায় বন বিভাগের উদ্যোগ আগের তুলনায় বেড়েছে, এটি ইতিবাচক। তবে শুধু অভিযান চালালেই হবে না। বন অপরাধে জড়িত প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জেলে ও বননির্ভর মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা গেলে বনজ সম্পদের ওপর চাপও কমবে এবং অপরাধও হ্রাস পাবে।

পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাসানুর রহমান বলেন, আগে টহল কার্যক্রম মূলত নৌকানির্ভর ছিল। এখন প্রতিটি ক্যাম্প ও স্টেশনকে প্রতিদিন নির্ধারিত এলাকায় নিয়মিত টহল দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুর্গম এলাকায় ড্রোন ব্যবহার করে অবৈধ দখল, বিষ দিয়ে মাছ ধরা এবং বন্যপ্রাণী শিকারের মতো অপরাধ শনাক্ত করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, সুন্দরবন সংলগ্ন ৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। মানুষ-বাঘ সংঘাত কমাতে প্রায় ৭৪ কিলোমিটার প্রতিরোধমূলক বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি জলাবদ্ধতার সময় বন্যপ্রাণীর আশ্রয়ের জন্য মাটির কিল্লা এবং মিষ্টি পানির উৎস তৈরিতে পুকুর খনন করা হয়েছে।

বন বিভাগের বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—২৩ হাজারের বেশি অভিযান চালিয়েও বন অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না কেন? ১ হাজার ৩৭৩টি মামলার মধ্যে মাত্র ৩৫১টির চার্জশিট কেন হয়েছে? দণ্ডিতের সংখ্যা এত কম কেন? যেসব এলাকায় বারবার বিষ দিয়ে মাছ ধরা হচ্ছে, সেখানে স্থায়ী নজরদারি আরও জোরদার করা সম্ভব কি না?

সুন্দরবন রক্ষায় বন বিভাগের নিয়মিত অভিযান, ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম, মানুষ-বাঘ সংঘাত কমাতে প্রতিরোধমূলক বেড়া এবং বন্যপ্রাণীর জন্য মাটির কিল্লা নির্মাণ ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে একই সঙ্গে পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, বন অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান নয়—শূন্য পদ পূরণ, আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ, দ্রুত বিচার এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে সুন্দরবন সংরক্ষণ আরও কার্যকর হবে।

MCH
আরও পড়ুন