চারপাশে ঘন ঝোপঝাড়। লতাপাতার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে ইটের পুরোনো দেয়াল। কোথাও ভাঙা গাঁথুনি, কোথাও আবার দেয়ালের গায়ে টিকে আছে ফুল ও লতাপাতার নকশার ক্ষীণ চিহ্ন। মাথার ওপর নেই ছাদ, নেই গম্বুজের পূর্ণ অবয়ব। মসজিদের ভেতর জন্ম নেওয়া বড় একটি গাছের শিকড়ও ঢুকে পড়েছে দেয়ালের গাঁথুনিতে। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে শোনা যায় না আজানের ধ্বনি।
নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার পাকা ইউনিয়নের চকমাহাপুর গ্রামের নির্জন এই স্থাপনাটি স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘আবদালের মসজিদ’ নামে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় তিন শতাব্দী পুরোনো এই মসজিদ এখন অযত্ন, অবহেলা ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ের কারণে ধ্বংসের মুখে। দ্রুত সংরক্ষণ করা না হলে অবশিষ্ট দেয়ালও হারিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
সরেজমিনে দেখা যায়, চকমাহাপুর থেকে বাঘা ও আড়ানীর দিকে যাওয়ার প্রধান সড়ক থেকে একটি সরু পথ পশ্চিম দিকে চলে গেছে। প্রায় ২০০ গজ এগিয়ে গেলেই ঘন জঙ্গলের মধ্যে দেখা মেলে মসজিদের ধ্বংসাবশেষের। প্রায় ১৯ শতক জমির উঁচু ভিটার একাংশে দাঁড়িয়ে আছে স্থাপনাটির অবশিষ্ট দেয়াল। চারদিকে খেজুর, ভেন্নাসহ বিভিন্ন গাছ ও ঝোপঝাড়ে জায়গাটি প্রায় ঢাকা পড়ে আছে। মানুষের যাতায়াতও খুবই সীমিত।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় এই ভিটা আশপাশের জমির তুলনায় বেশ উঁচু ছিল। সেখানে মসজিদ ছাড়াও আরও কিছু পুরোনো স্থাপনা, বাড়িঘর ও ইটের দেয়াল ছিল। সময়ের সঙ্গে এসব স্থাপনার অধিকাংশই বিলীন হয়ে গেছে। কিছু অংশ মাটির নিচে দেবে গেছে, আবার পুরোনো ইটের অনেকটাই বিভিন্ন সময়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এমনকি পাশের একটি নতুন মসজিদের প্রাচীর নির্মাণেও পুরোনো ইট ব্যবহারের দাবি করেছেন তারা। তবে এসব ইট ঠিক কোন সময়ের স্থাপনা থেকে নেওয়া হয়েছে, তা প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে যাচাই করা হয়নি।
নদী, চুনশিল্প ও আবদাল সম্প্রদায়ের স্মৃতি
আবদালের মসজিদের ইতিহাস নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে নানা কথা। লোকমুখে জানা যায়, একসময় পদ্মার শাখা বড়াল নদ থেকে উৎপন্ন একটি নদী এ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো। নদীটি স্থানীয় মানুষের যোগাযোগ ও জীবিকার অন্যতম মাধ্যম ছিল। নদীতে প্রচুর ঝিনুক ও শামুক পাওয়া যেত। সেগুলো পুড়িয়ে চুন তৈরি করা হতো। তৎকালীন সময়ে ভবন নির্মাণ, গাঁথুনি, প্লাস্টার ও বিভিন্ন অলংকরণে চুনের ব্যবহার ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
এই চুন তৈরির পেশার সঙ্গে যুক্ত একটি মুসলিম জনগোষ্ঠী স্থানীয়ভাবে ‘আবদাল সম্প্রদায়’ নামে পরিচিত ছিল বলে প্রবীণদের ভাষ্য। তাদের বসতি ও পেশাজীবনের সঙ্গে মসজিদটির সম্পর্ক রয়েছে বলেও দাবি স্থানীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে আগ্রহীদের।
তাদের মতে, মসজিদটি কেবল একটি পুরোনো ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নদীকেন্দ্রিক জনপদের বিকাশ, প্রাচীন চুনশিল্প এবং একটি পেশাভিত্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার স্মৃতি। তবে এসব তথ্যের ঐতিহাসিক সত্যতা নির্ধারণে এখনো কোনো বিস্তারিত প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা বা বৈজ্ঞানিক জরিপ হয়নি।
দেয়ালে এখনো নির্মাণশৈলীর চিহ্ন
বর্তমানে টিকে থাকা অংশের দৈর্ঘ্য আনুমানিক ১০ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ১২ ফুট। মাটি থেকে দেয়ালের উচ্চতা ১০ থেকে ১২ ফুটের মতো। দেয়ালের পুরুত্ব আনুমানিক দেড় ফুট। ছোট আকারের পুরোনো ইট ও সুরকির গাঁথুনিতে তৈরি দেয়ালগুলো এখনো স্থাপনাটির প্রাচীন নির্মাণকৌশলের সাক্ষ্য বহন করছে।
মসজিদের দরজাগুলোও এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। পূর্ব ও পশ্চিম দেয়ালে পুরোনো নির্মাণশৈলীর বেশ কয়েকটি দরজার চিহ্ন দেখা যায়। দরজার গাঁথুনিতে কয়েক সারি পুরোনো ইটের স্তর রয়েছে। কোথাও কোথাও দেয়ালের গায়ে ফুল ও লতাপাতার মতো অলংকরণের ক্ষীণ চিহ্নও টিকে আছে।
তবে দীর্ঘদিন ছাদহীন অবস্থায় পড়ে থাকায় বৃষ্টি, রোদ ও আর্দ্রতার প্রভাবে দেয়ালগুলো ক্ষয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে গাছের শিকড়। মসজিদের ভেতর জন্ম নেওয়া একটি বড় গাছের শিকড় দেয়ালের গাঁথুনির ভেতরে প্রবেশ করেছে। এতে ইট আলগা হয়ে স্থাপনাটির কাঠামোগত ক্ষতি আরও বাড়ছে।
নদী হারিয়েছে, হারিয়েছে পেশাও
স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, সময়ের সঙ্গে নদীটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় ঝিনুক ও শামুকের প্রাপ্যতা কমে যায়। ফলে চুন তৈরির ঐতিহ্যবাহী পেশাটিও ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়। জীবিকার প্রয়োজনে আবদাল সম্প্রদায়ের মানুষ অন্য পেশায় চলে যান এবং অনেকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র বসতি গড়েন।
তাদের চলে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে মসজিদটিও। একসময় যে স্থাপনার আশপাশে মানুষের বসতি ছিল, সেখানে এখন দিনের অধিকাংশ সময়ই নীরবতা। জঙ্গল ও সাপ-পোকামাকড়ের ভয়েও মানুষ সেখানে যেতে চান না বলে জানান স্থানীয়রা।
বর্তমানে মসজিদের আশপাশের জমি যেসব পরিবার ভোগদখল করছে, তাদের একজন মোস্তাক মণ্ডল বলেন, আবদাল সম্প্রদায়ের লোকজন এলাকা ছেড়ে যাওয়ার সময় তাদের পূর্বপুরুষদের কাছে এসব জমি হস্তান্তর করেছিলেন বলে তারা শুনে আসছেন। প্রায় ১৯ শতক জমির পুরোনো ভিটার মধ্যেই মসজিদটির অবস্থান।
তিনি বলেন, একসময় এখানে আরও কয়েকটি বাড়িঘর ও স্থাপনা ছিল। পরে সেগুলো ভেঙে যায়। কিছু স্থাপনা মাটির নিচে চলে গেছে। পুরোনো মসজিদটি তাদের কাছে পূর্বপুরুষদের স্মৃতির অংশ। সরকার যদি এটিকে ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়, তাতে তাদের আপত্তি নেই।
স্থানীয় প্রবীণ আলহাজ তছির উদ্দিনের বয়স প্রায় ১০০ বছর। তাঁর ভাষ্য, ছোটবেলা থেকেই তিনি মসজিদটির ধ্বংসাবশেষ দেখে আসছেন। তাঁর জানা মতে, তাঁদের বাপ-দাদার সময়েরও আগে থেকে এখানে মসজিদটি ছিল।
তছির উদ্দিন বলেন, একসময় মসজিদের চারপাশে আরও অনেক পুরোনো স্থাপনা ও ইটের দেয়াল ছিল। পরে সেগুলোর অনেকটাই মানুষ নিয়ে গেছে। এখন অবশিষ্ট দেয়ালগুলোই ওই সময়ের স্মৃতি বহন করছে।
আরেক বাসিন্দা নাজিম উদ্দিন বলেন, আগে ভিটাটি আশপাশের জমির চেয়ে অনেক উঁচু ছিল। চাষাবাদের প্রয়োজনে আশপাশের জমি কাটতে কাটতে সেই উচ্চতার পার্থক্য কমে গেছে। জঙ্গলের কারণে এখন সেখানে সহজে কেউ ঢোকে না। অথচ জায়গাটি গ্রামের বহু পুরোনো ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার দাবি
বাগাতিপাড়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা করা অবসরপ্রাপ্ত উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা আজিজুর রহমানের দাবি, প্রায় ৩০০ বছর আগে নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর শাসনামলে চকমাহাপুর গ্রামের নদীতীরে আবদাল সম্প্রদায়ের লোকজন মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন।
আজিজুর রহমান বলেন, ওই সময়ে এ অঞ্চলে চুনশিল্প গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি ছিল। সেই পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের ধর্মীয় প্রয়োজন থেকেই মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসে প্রচলিত রয়েছে। এর নির্মাণশৈলীও তৎকালীন গ্রামীণ স্থাপত্যের একটি স্বতন্ত্র নিদর্শন হতে পারে।
তবে মসজিদটির নির্মাণকাল, নির্মাতা, স্থাপত্যশৈলী এবং আবদাল সম্প্রদায়ের সঙ্গে এর সম্পর্ক নিশ্চিত করতে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে স্থাপনাটি সরকারি নজরদারি ও সংরক্ষণের বাইরে রয়েছে। ফলে গাছের শিকড়, বৃষ্টি ও জঙ্গলের কারণে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেয়াল। পুরোনো ইটও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
তাদের দাবি, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে দ্রুত স্থাপনাটির জরিপ ও গবেষণা করা হোক। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক ভিটার সীমানা নির্ধারণ, জঙ্গল পরিষ্কার এবং প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
পাকা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন বলেন, আবদালের মসজিদ এলাকার একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে স্থানীয়দের কাছে পরিচিত। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে জায়গাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং স্থাপনাটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করবেন তিনি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুল ইসলাম বলেন, আবদালের মসজিদ ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে থাকলে বিষয়টি যাচাই করে দেখা হবে। প্রয়োজন হলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নাটোরের বাগাতিপাড়ার প্রত্যন্ত এই স্থাপনাটি তাই এখন শুধু ভাঙা ইটের দেয়াল নয়—স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে এটি একটি হারিয়ে যাওয়া জনপদ, বিলুপ্তপ্রায় একটি পেশা এবং কয়েক শতকের ধর্মীয়-সামাজিক ইতিহাসের সম্ভাব্য সাক্ষী। যথাযথ গবেষণা ও সংরক্ষণ না হলে এই ইতিহাসের দৃশ্যমান শেষ চিহ্নটুকুও হয়তো একদিন হারিয়ে যাবে।
চীনা দূতাবাসের প্রতিনিধিদলের মাভাবিপ্রবি পরিদর্শন
জিপিএ-৫ পাওয়া ৮৫০ শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা দিলেন প্রতিমন্ত্রী টুকু
আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চায় সরকার: সাকি