পৃথিবীর জলবায়ু আগের চেয়ে অনেক বেশি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে এবং পৃথিবী এখন এমনভাবে তাপ শোষণ করছে যা আগে কখনো দেখা যায়নি। সোমবার (২৩ মার্চ) ‘বিশ্ব আবহাওয়া দিবস’ উপলক্ষে প্রকাশিত এক বার্ষিক প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে জাতিসংঘের আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক সংস্থা (WMO)।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, গ্রিনহাউস গ্যাসের ক্রমবর্ধমান স্তরের কারণে রেকর্ড তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বরফ গলে যাওয়া এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব আগামী হাজার বছর ধরে স্থায়ী হতে পারে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (WMO) ‘স্টেট অফ দ্য গ্লোবাল ক্লাইমেট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়কাল ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম ১১টি বছর। ২০২৫ সাল ছিল গত ১৭৬ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় বা তৃতীয় উষ্ণতম বছর। গত বছর বিশ্বের গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের (১৮৫০-১৯০০) তুলনায় প্রায় ১.৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে ‘এল নিনো’ (El Niño) আবহাওয়া প্যাটার্ন সক্রিয় হলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে এবং নতুন নতুন রেকর্ড তৈরি করতে পারে।
এই প্রথমবার জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ‘আর্থ এনার্জি ইমব্যালেন্স’ বা পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্যহীনতাকে মূল জলবায়ু সূচক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি মূলত পরিমাপ করে সূর্য থেকে কতটুকু শক্তি পৃথিবীতে প্রবেশ করছে আর কতটুকু মহাকাশে ফিরে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন এবং নাইট্রাস অক্সাইডের পরিমাণ এখন গত ৮ লক্ষ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এর ফলে পৃথিবী আগের চেয়ে অনেক বেশি তাপ আটকে ফেলছে।
অতিরিক্ত এই তাপের ৯১ শতাংশই শোষণ করছে মহাসাগরগুলো। এর ফলে গত ৯ বছর ধরে সমুদ্রের তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় রয়েছে এবং ২০২৫ সালে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহও দেখা গেছে।
সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বরফ গলে যাওয়ার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ১৯৯৩ সালে স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৫ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ১১ সেন্টিমিটার (৪.৩ ইঞ্চি) বেড়ে গেছে। উত্তর আমেরিকা ও আইসল্যান্ডের হিমবাহগুলোও দ্রুত বিলীন হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রভাব কেবল প্রকৃতিতে নয়, মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও বড় আঘাত হানছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১২০ কোটি শ্রমিক (মোট শ্রমশক্তির এক-তৃতীয়াংশ) প্রচণ্ড ‘হিট স্ট্রেস’ বা তাপজনিত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন, বিশেষ করে কৃষি ও নির্মাণ খাতের কর্মীরা। এছাড়া ডেঙ্গু এখন বিশ্বের দ্রুততম ছড়িয়ে পড়া মশাবাহিত রোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যার ফলে বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যাই ঝুঁকির মুখে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময় জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস দেশগুলোকে জীবাশ্ম জ্বালানি (Fossil Fuel) থেকে সরে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের এই গ্রহ সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে। জলবায়ু বিশৃঙ্খলা দ্রুততর হচ্ছে এবং এখন ব্যবস্থা নিতে দেরি করা মানেই মৃত্যু ডেকে আনা।’
জলবায়ু পরিবর্তন: ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে পরিবেশ 
