হাম ও উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ১১:৩৩ পিএম

দেশে হামের প্রকোপ নিয়ে সরকারি ঘোষণা ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সোমবার (১৫ জুন) দাবি করেছেন, হামে মৃত্যুহার শূন্যে নেমে এসেছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে নিশ্চিতভাবে হামে কোনো মৃত্যু হয়নি এবং উপসর্গজনিত মৃত্যুর সংখ্যাও পাঁচের নিচে নেমে এসেছে। কিন্তু একই দিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র, গত ২৪ ঘণ্টায় হামে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজন নিশ্চিত হামে আক্রান্ত ছিলেন, আর তিনজন মারা গেছেন হামের উপসর্গ নিয়ে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত দেশে হামে ও হামের উপসর্গে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৫৬। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৯৩ জনের, আর উপসর্গজনিত মৃত্যু হয়েছে ৫৬৩ জনের। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৬৪ জনের শরীরে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। সবমিলিয়ে দেশে এখন পর্যন্ত ১০ হাজার ৩৮৭ জন নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছেন। সন্দেহভাজন সংক্রমণসহ মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার ৩১০ জনে।

গত পাঁচ দিনের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এ সময়ে হামের উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ১৬ শিশুর এবং নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে একজনের। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েক দিনের তথ্যের ভিত্তিতে মৃত্যুহার শূন্যে নেমে এসেছে বলা বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ নয়। তাদের মতে, সংক্রামক রোগের প্রকোপ সাময়িকভাবে কমলেও তা আবার বেড়ে যেতে পারে। তাই অন্তত আরও এক থেকে দুই সপ্তাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা জরুরি।

এদিকে দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে হামে আক্রান্ত রোগীদের চাপ কমেনি। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধা না থাকায় স্থানীয়ভাবে তৈরি ‘বাবল সিপ্যাপ’ ব্যবহার করে গুরুতর শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও একই সংকট। সেখানে ১৪০ জন হাম রোগীর জন্য আইসিইউ শয্যা রয়েছে মাত্র ১৫টি। ফলে প্রতিদিনই কয়েকজন শিশুকে আইসিইউর জন্য অপেক্ষা করতে হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কোনো শয্যা খালি হয় কেবল তখনই, যখন কোনো রোগী সুস্থ হয়ে সাধারণ শয্যায় যায় বা মারা যায়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, 'হামে মৃত্যুর সংখ্যা কয়েকদিন ধরে ১০-এর নিচে থাকলেও এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না যে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। রোগতাত্ত্বিক মূল্যায়নের জন্য আরও সময় প্রয়োজন।' তার মতে, মন্ত্রীর বক্তব্য সম্ভবত সাময়িক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, হাসপাতালগুলোর বাস্তব চিত্র বলছে, হামের প্রকোপ এখনো গুরুতর। অভিভাবকরা সন্তানদের নিয়ে হাসপাতালের বারান্দা কিংবা মেঝেতে অপেক্ষা করছেন চিকিৎসার জন্য। পর্যাপ্ত শয্যা, আইসিইউ সুবিধা ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটের কারণে চিকিৎসকরা সীমিত সম্পদ দিয়েই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

এই বৈপরীত্যপূর্ণ পরিস্থিতি জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৃত্যুহার শূন্যে নেমে এসেছে বলে ঘোষণা দেওয়ার আগে নিশ্চিত তথ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ জরুরি। অন্যথায় জনস্বাস্থ্য নীতিতে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে এবং আক্রান্ত পরিবারগুলো আরও বেশি অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে।

Attr
আরও পড়ুন