বন্ধুমহলে আড্ডা হোক কিংবা অফিসের জরুরি মিটিং কিছু মানুষ আছেন যাদের উপস্থিতি মানেই নির্ধারিত সময়ের অন্তত আধা ঘণ্টা পর। এই ‘লেট লতিফ’ তকমাধারী ব্যক্তিদের নিয়ে হাসাহাসি কম হয় না, কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, সব সময় দেরি হওয়াটা কেবল দায়িত্বহীনতা বা অবহেলার ফল নয়। এর পেছনে রয়েছে মস্তিষ্কের গঠন, ব্যক্তিত্ব এবং জৈবিক ঘড়ির মতো গভীর বৈজ্ঞানিক কারণ।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘস্থায়ীভাবে দেরি করার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ‘প্ল্যানিং ফ্যালাসি’ বা পরিকল্পনার ভুল। এটি একটি বিশেষ ধরনের জ্ঞানীয় পক্ষপাত (Cognitive Bias)। এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা কোনো কাজ শেষ করতে আসলে কত সময় লাগবে, তা সঠিকভাবে অনুমান করতে পারেন না। তারা সাধারণত যাতায়াতের পথে যানজট বা অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিঘ্নের কথা মাথায় রাখেন না। ফলে তাদের হাতে পর্যাপ্ত অতিরিক্ত সময় থাকে না।
অনেকের মধ্যে কাজ করে ‘পার্সোনাল স্পিড ইলিউশন’। তারা মনে করেন, শেষ মুহূর্তের তাড়াহুড়োয় সব কাজ গুছিয়ে নিতে পারবেন। এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত তাদের সময়সূচিকে এলোমেলো করে দেয়।
ব্যক্তিত্ব ও জৈবিক ঘড়ির প্রভাব
গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যক্তিত্বের ধরন সময়ানুবর্তিতার ওপর বড় প্রভাব ফেলে:
- সচেতনতা: যাদের মধ্যে সচেতনতাবোধ বেশি, তারা প্রাকৃতিকভাবেই গোছানো এবং সময়নিষ্ঠ হন।
- অগোছালো স্বভাব: যারা প্রাকৃতিকভাবে কিছুটা অগোছালো, তাদের মস্তিষ্কের পক্ষে সময়ের নিখুঁত হিসাব রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
- নাইট আউল: যারা রাতে দেরিতে ঘুমান (Night Owl), তাদের জৈবিক ঘড়ি বা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ সকালে দেরিতে সক্রিয় হয়, ফলে দিনের শুরু থেকেই তারা পিছিয়ে পড়েন।
- টাইম ব্লাইন্ডনেস: এডিএইচডি (ADHD)-র মতো নিউরোডাইভারজেন্ট বৈশিষ্ট্যের অধিকারীদের মধ্যে ‘সময়ের অন্ধত্ব’ দেখা যায়, যার ফলে তারা সময়ের প্রবাহ অনুভব করতে হিমশিম খান।
সাংস্কৃতিক ভিন্নতাও সময়ের গুরুত্ব নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। লাতিন আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সম্পর্কের গুরুত্ব সময়ের চেয়ে বেশি দেওয়া হয়, ফলে সেখানে সামাজিক যোগাযোগে সময় কিছুটা শিথিল থাকে।
উত্তরণের বৈজ্ঞানিক পথ
বিজ্ঞান কেবল সমস্যার কারণই জানায়নি, সমাধানের পথও বাতলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন:
- দ্বিগুণ সময় রাখা: কোনো কাজে যতটুকু সময় লাগবে মনে হয়, হাতে তার দ্বিগুণ সময় নিয়ে পরিকল্পনা করা।
- ক্ষুদ্র ভাগে ভাগ করা: তৈরি হওয়া বা বের হওয়ার মতো প্রতিটি ছোট পদক্ষেপের জন্য আলাদা সময় বরাদ্দ করা।
- প্রযুক্তির ব্যবহার: কেবল ইচ্ছাশক্তির ওপর নির্ভর না করে অ্যালার্ম, রিমাইন্ডার বা ডিজিটাল টুলের সাহায্য নেওয়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত দেরি করা মানুষদের প্রতি সহমর্মিতা দেখালে এবং সঠিক কাঠামোগত পরিবর্তন আনলে এই অভ্যাস পরিবর্তন করা সম্ভব। এতে যেমন সম্পর্কের টানাপোড়েন কমে, তেমনি পেশাগত জীবনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ক্ষুধা পেলে কিছু মানুষ মেজাজ হারান কেন?
২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় ৮ বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ
