ভূমিহীন এক রাজার গল্প

আপডেট : ২০ মে ২০২৬, ০৯:৫৩ এএম

দেশের বাইরে বিদেশের কথা জানি না তবে বাংলাদেশের কোন তহশিল বা ভুমি অফিসে এক ছটাক জমিও নেই তার নামে।হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া, উজির, নাজির, পেয়াদা পাইক বরকান্দাজও নেই। ভূপতি, ভূস্বামীও তিনি নন। তার নাম রাজা। তবে গায়ে গতরে সুঠাম দেহধারী, ওজনদার, বড় মাথা রাজার আকার। কিন্তু তার দুটি চোখ পর্বত, সমুদ্র না আকাশকে ইঙ্গিত করে আমি আজও ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। তবে তিনি রাজা রাজশাহীর রাজা, তসিকুল ইসলাম রাজা (১৯৫৩-২০২৬)।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় জন্মের বছরই (১৯৫৩) তার জন্ম। রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ি বালিয়াঘাটা গ্রামে তার নাড়ি পোতা। বাবা মা নানির আপত্য স্নেহ ভালোবাসা তার হৃদয়ে ইনস্টল করা ছিল বেশ বোঝা যেত। রাজশাহী নগরী বরেন্দ্রভূমির শিক্ষা সভ্যতায় দীপ্যমান আলোক মশাল ধরে রেখেছে বহুকাল আগে থেকেই। বলা যায় পাল সাম্রাজ্যের সকল সভ্যতার পীঠস্থান হচ্ছে বরেন্দ্র অঞ্চল। ৫ম থেকে ৮ম শতক পর্যন্ত বৌদ্ধ শিক্ষা সভ্যতার পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে পাল রাজন্যবর্। প্রকৃত অর্থে সমাজতত্ত্ব ও নৃতত্ত্বের শিক্ষার্থী হিসেবে আমার মনে হয় বরেন্দ্র ভূমির অনেক কিছু আজও অনাবিষ্কৃত। এই উর্বর জমিনের কাদা-জলে কখনও বা উষ্ণ তাপদাহে বেড়ে ওঠা আমাদের রাজা। শৈশবে মাতৃদুগ্ধ, গোদুগ্ধ, ডাল-মাছ, শাক-ভাত খেয়ে যার বেড়ে ওঠা তার দেহ অবয়ব রাজার আকৃতিই তো ধারিণ করবে। কারণ আমাদের রাজা প্রকৃতির সন্তান। আমাদের প্রশ্ন তিনি রাজা, কোন রাজাসনে বসে তিনি রাজ্য চালিয়ে গেলেন? জন্ম সন এক হলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও আমাদের রাজাভাই সমতলে বেড়ে উঠতে পারেননি। সরকারি আদর স্নেহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় সুবিশাল বহরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সুন্দর ফ্রেমে বিকশিত হয়েছে। আর আমাদের রাজা ভাই একক চেষ্টা ও আপনার আগ্রহে বেড়ে ওঠেন। সেলফমেড এই মানুষটি আমাদের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। আজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও ড. তসিকুল ইসলাম রাজা ৭৩ বছরের চৌকাঠ পেরুলেন। রাজাভাই জীবন চৌকাঠ পেরিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

আমাদের রাজার স্থানান্তর গমন গোদাগাড়ি থেকে রাজশাহী নগরী।রাজশাহী থেকে আবার বালিয়াঘাটা গ্রাম। গরু মহিষের গাড়ি, টমটম বা রেলপথ, পায়ে হাটাপথ, রেল কিংবা নৌপথ সবই তার চেনা পথ। রাজশাহীতে তার বেড়ে ওঠা, পূর্ণতাপ্রাপ্তি। ১৯৭০ সালে কাশিমপুর একে ফজলুল হক হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক ও নবাবগঞ্জ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে রাজশাহীতে থিতু হন।রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। পড়ালেখায় দুর্দমনীয় আকর্ষণ ছিল, ছিল না পৃষ্ঠপোষক ও অভিভাবক। রাজশাহী নগরীর সাহিত্যমোদি সকল ক্ষেত্রেই ছিল তার সপ্রতিভ বিচরণ। রাজশাহীতে এসে বাংলাদেশ বেতারের সাথে সংযোগ ঘটা, টুকটাক সাংবাদিকতা, লেখালেখি, ঘোরাঘুরিতে বেড়ে ওঠেন আমাদের ভূমিহীন রাজা। নিয়মিত ছাত্র ছিলেন না আমাদের রাজা ভাই। তবে সাহিত্য সংগঠন লেখালেখি গবেষণায় জুড়ি নেই তার। উচ্চতর ডিগ্রির জন্য ছুটে যান ভারত বর্ষে্র রবীন্দ্র ভারতী অবধি। গ্রামীণ জনপদের কবিদের নিয়ে গবেষণা করে পি-এইচডির থিসিসটি গুণি মহলে নন্দিত হয়। ১৯৯৫ সালে বাংলা একাডেমি থেকে বেশ দ্রুততার সাথে তা প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা বিদ্যাসাগর অধ্যাপক ক্ষেত্রগুপ্তের তত্ত্বাবধানে গবেষণার এই মৌলিক কাজটি সম্পন্ন করে সাহিত্যাঙ্গনে অনেক বেশি দিন তিনি বেঁচে থাকবেন বলে মনে করি। আবার ‌‘বাংলা একাডেমি’ পুরস্কারেও তিনি ভুষিত হয়েছেন। লেখা পড়া, সংসার সাহিত্য চর্চা সব মিলিয়ে তার সংগ্রামী জীবন। রাজশাহীর শাহ মখদুম কলেজে সুদীর্ঘদিন বাংলা ভাষা সাহিত্যের অধ্যাপনা ও অধ্যক্ষের গুরু দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজশাহী এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক পদে দীর্ঘ সময় ক্লান্তিহীন পরিশ্রম করেন। নিরন্তর ব্যস্ততার মাঝেও ক্লান্তি অনুভব করেননি। মুখে না শব্দটিও কখনও উচ্চারণ করেননি।

আমাদের ভূমিহীন রাজার সকল দুয়ার খোলা। ঘরের দুয়ার, মনের দুয়ার আর মোবাইলের দুয়ার কখনও বন্ধ করেননি তিনি। অনেকের জন্য অনেক কাজ করে দিয়েছেন কিন্ত তার জন্য কতটুকু কে করেছেন বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন কি? তাকে অনেকেই সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে অনেকেই অনেক কিছু জুটিয়ে নিয়েছেন। আর ভূমিহীন রাজা একইভাবে কাটিয়ে দিলেন আজীবন। তার সহধর্মীনি অকাতরে বিলিয়ে দিয়ে ভূমিহীন ভবঘুরেকে প্রকৃত রাজা বানিয়েছিলেন। সম্রাজ্ঞীর রাজমুকুট ছিল না ঠিকই কিন্তু রাজসুখ ছিল তাদের পরিবারে। তাদের হীরের টুকরো কন্যাও পুত্র খুবই মেধাবী ও বিনয়ী। তাদের মা বেশ কবছর আগে অকালেই মৃত্যু বরণ করেন। আজ বাবাকে হারালেন। যেখানে সংগ্রাম, সেখানে ভালোবাসা রাগ-অনুরাগ কতযে অটুট, কতযে মধুর ‘এরামন ভিলায়’ আনন্দ-জোছনার জোয়ার দেখে আমরা অনুভব করেছি। আজ এরামন ভিলায় বিদায়ী রক্তিম রাগ। বিদায় ভূমিহীন রাজা, বিদায়।

AHA
আরও পড়ুন