বিমা করার আগে কী কী বিষয় খেয়াল রাখতে হবে

আপডেট : ২০ মে ২০২৬, ১১:৪২ এএম

লাইফ ইনস্যুরেন্স বা জীবন বিমা ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার পরিবারের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে। সেই সঙ্গে বিমা পলিসির মেয়াদপুর্তিতে মুনাফাসহ সমুদয় টাকা ফেরত পাওয়া যায়। তবে এটি শুধু সঞ্চয়ের মাধ্যম নয়, বরং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় একটি কার্যকর উপায়।

বিমা নিয়ে দেশে একধরনের নেতিবাচক ধারণা প্রচলিত আছে। প্রয়োজনের সময় বা মেয়াদান্তে টাকা ফেরত পাওয়া যাবে কিনা সে নিয়ে অনেকেই দুশ্চিন্তায় থাকেন। তবে কয়েকটি বিষয় যাচাই-বাছাই করে সঠিক জীবন বিমা কোম্পানি বেছে নেওয়া যেতে পারে। এতে যেমন আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত হয়, তেমনই বিমার টাকা পাওয়া নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো সমস্যায় পড়তে হয় না। 

নিজের আর্থিক সক্ষমতা যাচাই
বিমা অঙ্ক বড় হলে তার প্রিমিয়ামও বেশি হয়। দেখা যায়, আর্থিক অবস্থা ভালো থাকার সময় অনেকে বড় অঙ্কের বিমা পলিসি কিনেছেন, কিন্তু পরে তা আর চালিয়ে নিতে পারছেন না। দীর্ঘমেয়াদি বিমা পলিসি কেনার ক্ষেত্রে তাই ভবিষ্যৎ আর্থিক সামর্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। এমনভাবে বিমা অঙ্ক নির্ধারণ করতে হবে যাতে প্রিমিয়ামের পরিমাণ সব অবস্থায় নাগালের মধ্যে থাকে।

বিমা কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা
বিমা এমন একটি সেবা, যার সুবিধা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। তাই যেখানে বিমা করবেন সেই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত্তি কতটা মজবুত, তা যাচাই করা সবচেয়ে জরুরি। জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানটি কতদিন ধরে কাজ করছে তা দেখা নেওয়া উচিত। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী হতে সময়ের প্রয়োজন। নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে বিমা পলিসি কেনার আগে ওই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে খুব ভালো করে জেনে নেওয়া ভালো। 

বিমা কোম্পানি কি নির্ভরযোগ্য
প্রথমেই দেখুন, বিমা কোম্পানিটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’ (আইডিআরএ)-র অনুমোদন পেয়েছে কিনা।

প্রতিষ্ঠানের সুনাম
যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সুনাম অত্যন্ত জরুরি। কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ পদে কারা আছেন, তাদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কেমন তা জেনে নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে, বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে কী ধরনের খবর প্রকাশিত হচ্ছে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। এর মাধ্যমে কোম্পানির সুনাম সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়। গ্রাহক সংখ্যা, করপোরেট গ্রাহকের তালিকা এবং বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাও একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মদক্ষতার পরিচায়ক।

বিমা নিয়ন্ত্রকের ওয়েবসাইটের তথ্য
বিমা পলিসি কেনার আগে প্রতিষ্ঠানের বিমা দাবি পরিশোধের বিষয়ে 'বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ'-এর ওয়েবসাইটে গিয়ে তথ্য যাচাই করতে পারেন। ওয়েবসাইটে 'নিষ্পন্ন/অনিষ্পন্ন দাবির তালিকা' ট্যাব থেকে কোম্পানিগুলোর এসব তথ্য জানতে পারবেন।

সঠিকভাবে ফরম পূরণ
বিমা পলিসি ক্রয়ের জন্য পলিসি ফরম পূরণ করতে হয়। ওই ফরমে গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্যের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের তথ্যও লিখতে হয়। এছাড়া নমিনিও নির্বাচন করতে হয় এবং শেষে সই দিতে হয়। ফরম পূরণ আবশ্যিকভাবে সঠিক হতে হবে। নইলে ভবিষ্যতে তা ঝামেলার কারণ হতে পারে।

পলিসির সব শর্ত কি পরিষ্কার
বিমা এজেন্ট যা বলছেন, শুধু তা নয়; পুরো পলিসি ডকুমেন্ট ভালো করে পড়ুন। দাবি করার সময় কী কী কাগজপত্র লাগবে, প্রিমিয়াম কত বছর দিতে হবে, সুবিধা কী কী—এসব জানা না থাকলে পরে হতাশ হতে পারেন।

সুবিধা বুঝে নিন
সুবিধাগুলো কি আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী? যেমন—চিকিৎসা বিমায় হাসপাতালের সীমা, জীবন বিমায় মৃত্যু বা দুর্ঘটনায় কত টাকা মিলবে।

বর্জনীয় বিষয় জানা জরুরি
বিমা পলিসিতে কিছু বিষয় কাভার করে না। যেমন: আত্মহত্যা, যুদ্ধজনিত ক্ষতি, বা মদপানের কারণে দুর্ঘটনা। এগুলো আগে না জানলে দাবি করার সময় টাকা পাবেন না।

তথ্য গোপন না করাই ভালো
বিমা নেওয়ার সময় নিজের বয়স, অসুখ-বিসুখ, অভ্যাস (যেমন- ধূমপান) সঠিকভাবে বলুন। মিথ্যা তথ্য দিলে পরবর্তীতে কোম্পানি দাবি খারিজ করে দিতে পারে।

‘ফ্রি লুক ইন’ পিরিয়ড (প্রথম ১৫ দিন)
বিমা নেওয়ার পর ১৫ দিনের মধ্যে আপনি যদি পলিসির শর্ত পছন্দ না করেন, তবে তা বাতিল করে প্রিমিয়াম ফেরত নিতে পারেন। এই সুযোগটা কাজে লাগান।

মিথ সম্পর্কে ধারণা
বিমায় বিনিয়োগকে অনেকে ব্যাংকের এফডিআরের সঙ্গে তুলনা করেন, যা ঠিক নয়। অনেকে মনে করেন মৃত্যুতেই কেবল বিমা সুবিধা পাওয়া যায়। এটাও ভুল ধারণা। অনেক তরুণ মনে করেন তাদের বিমা পণ্যের প্রয়োজন নেই। কিন্তু সব বয়সীদের জন্যই জীবন বিমা প্রযোজ্য। তরুণদের জন্য বরং প্রিমিয়াম হার অনেক কম থাকে।

বিমা পলিসি কেনার পর গ্রাহককে অবশ্যই বিভিন্ন বিষয় মাথায় রাখতে হবে। যেমন—যথাসময়ে প্রিমিয়ামের অর্থ ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং পদ্ধতিতে জমা দিতে হবে। গ্রাহককে অবশ্যই বিমার সব তথ্য ও জমার রসিদ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। প্রয়োজনে স্ক্যান করে গুগল ড্রাইভে সংরক্ষণ করা যায়। এসব দিক বিবেচনা করে বিমা পলিসি কিনলে বিমার প্রকৃত সুবিধা পাওয়া যাবে।

এজেন্টের কথায় না ভেবে কোম্পানিকে সরাসরি জানতে চান। এজেন্ট মোটা অংকের মুনাফার আশ্বাস দিলেও সেটা লিখিত পলিসিতে নেই—তবে তা বিশ্বাস করবেন না। প্রয়োজন হলে কোম্পানির কল সেন্টারে ফোন করে ভালো করে বুঝে নিন।

বিমা দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার ব্যবস্থা। তাই তাড়াহুড়ো করবেন না। একাধিক কোম্পানির পলিসি তুলনা করে, প্রয়োজনে অভিজ্ঞ কারও সাহায্য নিয়ে, তারপর বিমা করুন। 

আরও পড়ুন