সিঙ্গাপুরের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরান কর্তৃক ড্রোন হামলার অভিযোগে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এর জবাবে ইরানি ভূখণ্ডে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন হামলার পরপরই ওই অঞ্চলে অবস্থিত আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
মধ্যপ্রাচ্যে নিয়োজিত মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) শুক্রবার (২৬ জুন) এক বিবৃতিতে জানায়, গত বৃহস্পতিবার বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার এক শক্তিশালী ও উপযুক্ত জবাব দেওয়া হয়েছে। মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের উপকূলীয় রাডার স্টেশন এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণের গোপন ঘাঁটিগুলোতে সফলভাবে আঘাত হেনেছে। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিক বন্দরের কাছাকাছি এই মার্কিন হামলার ঘটনা ঘটে।
সেন্টকম আরও দাবি করেছে, ইরানের এই বিপজ্জনক আচরণ আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করিডোরের বাণিজ্যিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
আমেরিকার এই বিমান হামলার পর পরই ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা শুরু করে।
ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে আইআরজিসি সতর্ক করে বলেছে, আমেরিকা যদি আবারও কোনো আগ্রাসন বা হামলা চালানোর চেষ্টা করে, তবে আমাদের পরবর্তী জবাব এর চেয়েও আরও অনেক বেশি ব্যাপক ও ভয়াবহ হবে।
এই পাল্টাপাল্টি হামলার পর গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত দেড় পৃষ্ঠার যুদ্ধবিরতি সমঝোতা স্মারকটি টিকবে কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে। এই চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ করা, যার মাধ্যমে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধের অবসান ঘটার কথা ছিল।
তবে লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত বোমাবর্ষণের কারণে চুক্তিটি সংকটে পড়ে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় গত সপ্তাহে ইরান আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দেয়। মার্কিন সাবেক কূটনৈতিক অ্যালান আইর বলেন, "এই চুক্তির ভাষা অত্যন্ত অস্পষ্ট ছিল এবং ইরান চেয়েছিল তাদের নিজস্ব নিয়মে ও আইআরজিসির সমন্বয়ে জাহাজ চলাচল করুক, যা আমেরিকা কোনোভাবেই মেনে নিতে রাজি নয়।"
উত্তেজনার মূল সূত্রপাত গত বৃহস্পতিবার, যখন সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী ‘এভার লাভলি’ (Ever Lovely) নামের একটি কনটেইনার জাহাজ ওমান উপকূলের কাছাকাছি হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার সময় হামলার শিকার হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি করেন, ইরান ওই জাহাজ লক্ষ্য করে অন্তত ৪টি ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন (আত্মঘাতী ড্রোন) ছুড়েছিল। যার মধ্যে ৩টি ড্রোন ভূপাতিত করা হলেও চতুর্থ ড্রোনটি জাহাজের ওপরের ডেকে আঘাত হানে। যদিও এই ঘটনায় কোনো নাবিক আহত হননি এবং জাহাজটি তার যাত্রা বজায় রাখতে পেরেছে।
ট্রাম্প এই ঘটনাকে সমঝোতা স্মারকের একটি ‘বোকা ও জঘন্য লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছেন। হোয়াইট হাউসের এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, "তারা গতকাল যে হামলাটি চালিয়েছে তা আমার একদম পছন্দ হয়নি। জাহাজটি সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের এমনটা করা মোটেও উচিত হয়নি। এর পরিণতি কী হবে তা আপনারা দ্রুতই জানতে পারবেন।"
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও এই বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে লিখেছেন, "সহিংসতার জবাব সহিংসতা দিয়েই দেওয়া হবে। ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে এবং আমরা তা মেনে চলেছি। যদি সমঝোতা স্মারক (MOU) প্রয়োগের বিষয়ে তাদের কোনো দ্বিমত থাকে, তবে তারা ফোন তুলে আমাদের সাথে সরাসরি কথা বলতে পারত।"
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি কিমবার্লি হ্যালকেট জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন এই হামলাকে ইরানের অবাধ্যতা দমনের একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক পদক্ষেপটি অতীতের চেয়ে কিছুটা সংযত, কারণ তারা মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলা এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার মধ্যে একটি পার্থক্য বজায় রেখে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। তা সত্ত্বেও ওয়াশিংটনে এই সংকট আরও বড় যুদ্ধে রূপ নেওয়ার তীব্র আশঙ্কা করা হচ্ছে। সূত্র: আল জাজিরা
'ইরান হামলা চালালে ‘সবচেয়ে বড় ভুল’ হবে'
ইরান-লেবানন-পশ্চিম তীরে দেড় কোটি ডলার অনুদান দেবে জাপান
চীনে ১০৯ তলা ভবনে বিমান বিধ্বস্ত
মার্কিন সামরিক উপস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য বোঝা: ইরান