ব্রিকসের ভেতরে ইরান, রাশিয়া ও চীনের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন রুশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক লিওনিদ সাভিন। তার মতে, একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিপরীতে কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করতে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর আরও শক্তিশালী কাঠামো প্রয়োজন।
ইরানের বার্তা সংস্থা মেহর নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাশিয়ার প্রভাবশালী গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাতেহনের প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাভিন এসব কথা বলেন। হরমুজ প্রণালির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি ইরান, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
ইরান-রাশিয়া সম্পর্ক নিয়ে সাভিন বলেন, দুই দেশ নতুন একটি বিশেষ সহযোগিতা চুক্তিতে পৌঁছেছে, যা তাদের অংশীদারত্বকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তার দাবি, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে রাশিয়া বিদেশি হস্তক্ষেপ ও আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা থেকে শুরু করে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির প্রতি সমর্থন পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে তেহরানের পাশে রয়েছে। রাশিয়া ইরানের বুশেহর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণেও যুক্ত রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতার বিষয়টি প্রকাশ্যে বিস্তারিতভাবে জানা যায় না বলেও মন্তব্য করেন সাভিন। তবে তিনি বলেন, রাশিয়া থেকে ইরানের কাছে বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের তথ্য রয়েছে। একই সঙ্গে রুশ সামরিক বাহিনীর মহাকাশভিত্তিক নজরদারি সক্ষমতার কারণে ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ পশ্চিমা গণমাধ্যমে রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে এ ধরনের সহযোগিতার প্রকৃত পরিসর স্পর্শকাতর তথ্যের কারণে জানা কঠিন বলে জানান সাভিন।
দুই দেশের সহযোগিতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলেও মত দেন তিনি। বিশেষ করে কাস্পিয়ান অঞ্চলকে কেন্দ্র করে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি গঠনের কথাও উল্লেখ করেন এই রুশ বিশ্লেষক।
ইউক্রেন যুদ্ধ ও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলাকে আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখেন না সাভিন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়া, ইরান ও চীনের বিরুদ্ধে বৃহত্তর কৌশলগত প্রতিযোগিতায় রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সম্ভাব্য পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁকি এড়াতে রাশিয়া সরাসরি উত্তেজনা বাড়াতে চায় না। তবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন উসকানি হলে মস্কো পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইউক্রেন যুদ্ধের সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি নিয়েও সাভিন রাশিয়ার অবস্থান তুলে ধরেন। তার দাবি, মস্কো শান্তিচুক্তির জন্য প্রস্তুত থাকলেও ইউক্রেনের নিরস্ত্রীকরণ, ন্যাটোর সদস্যপদ প্রত্যাখ্যান, রুশ জনগোষ্ঠী ও রুশ অর্থোডক্স চার্চের অধিকার এবং রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত বলে মস্কো যে অঞ্চলগুলোকে বিবেচনা করে, সেগুলো নিয়ে নিজেদের শর্তে অটল রয়েছে।
বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন প্রসঙ্গে সাভিন বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং চীনের ওপর মার্কিন চাপকে তিনি বৃহত্তর বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে দেখেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা শক্তি সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক ক্ষেত্রে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে চায়। বিপরীতে রাশিয়া আরও ভারসাম্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা চায়।
ইরানের প্রতিরোধ নিয়েও প্রশংসা করেন সাভিন। তার মতে, ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া ছিল শক্তিশালী এবং একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে হিসাব করা। হরমুজ প্রণালি বন্ধের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের জন্য বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সাভিনের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো বদলে দিয়েছে। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে মক্কা চুক্তির কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ইয়েমেন, ইরাক ও লেবাননে ইরানের মিত্রদের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
ভবিষ্যতে রাশিয়া ও চীনের সহযোগিতা আরও বাড়বে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমতে পারে বলেও মত দেন সাভিন। তবে তার মতে, অঞ্চলটিতে উত্তেজনা ও সংঘাত অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
শেষে ব্রিকসের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরে সাভিন বলেন, একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার নিজস্ব কার্যকর প্রতিষ্ঠান রয়েছে, অর্থনীতিতে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, সামরিক ক্ষেত্রে ন্যাটো এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে জি-৭। এর বিপরীতে রাশিয়া, চীন, ইরানসহ ব্রিকসের অন্যান্য সদস্যকে একটি কার্যকর ও পূর্ণাঙ্গ ভারসাম্য কাঠামো গড়ে তুলতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পূর্ণমাত্রার হাইব্রিড যুদ্ধের’ মুখে ইরান: আইআরজিসি কমান্ডার
যে দুর্ঘটনা বদলে দেয় মাসুদ পেজেশকিয়ানের পুরো জীবন
‘বাইবেল না জানার’ কারণে ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সমর্থন কমছে: হাকাবি