পরমাণু কর্মসূচিতে অনড় ইরান, যুদ্ধের প্রস্তুতিও জোরদার

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫৪ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পরমাণু কর্মসূচি ও সামরিক সক্ষমতা নিয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে ইরান। হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করা, যুদ্ধ বন্ধ এবং ভবিষ্যৎ সমঝোতার শর্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ চলছে। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা কিংবা মজুত হস্তান্তরের বিষয়ে ওয়াশিংটনের দাবিতে সম্মত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়নি তেহরান।

একই সময়ে রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধে সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালিতে বিস্ফোরণের খবর এবং ইরানের অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় আড়াই গুণ হয়েছে বলে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের দাবি—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে কূটনীতি ও সামরিক উত্তেজনা পাশাপাশি এগোচ্ছে।

কয়েক দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে জবাব দেবে তেহরান

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করছে তেহরান। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ওয়াশিংটনের প্রস্তাবের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান জানানো হতে পারে।

৮ অক্টোবর ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা আইআরএনএর বরাতে আনাদোলু এজেন্সি জানায়, আরাঘচি বলেছেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে। ইরান ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু এবং আলোচনার পথ এগিয়ে নিতে সাত দিনের একটি পরিকল্পনা দিয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করছে তেহরান। 

প্রস্তাবটির লক্ষ্য শুধু প্রণালি খুলে দেওয়া নয়; বরং যুদ্ধ বন্ধের প্রক্রিয়া এবং ভবিষ্যৎ সমঝোতার জন্য আস্থা তৈরির পদক্ষেপ নির্ধারণ করা। ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম চার-পাঁচ দিনে কিছু শর্ত বাস্তবায়ন হলে ষষ্ঠ দিনে হরমুজে স্বাভাবিক নৌচলাচল ফিরিয়ে আনা এবং সপ্তম দিনে চূড়ান্ত সমঝোতা নিয়ে আলোচনা শুরুর কথা রয়েছে।

তেহরানের দাবির মধ্যে রয়েছে শত্রুতা বন্ধ, জব্দ করা ইরানি সম্পদ ছাড়, ইরানের তেল রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহার এবং ইরানি বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া। তবে এসব শর্তে ওয়াশিংটনের সম্মতির বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি। 

ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধে রাজি নয় ইরান

কূটনৈতিক যোগাযোগ চললেও পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ এসলামি বলেছেন, তেহরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করবে না এবং নিজেদের ইউরেনিয়ামের মজুতও হস্তান্তর করবে না।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যে এসলামি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে দেশটির পরমাণু কর্মসূচির ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের দাবির প্রতি তাঁর বক্তব্য ছিল প্রত্যাখ্যানমূলক। এর আগে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছিলেন, যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ইরানের সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতায় অর্থবহ হ্রাস প্রয়োজন। 

ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে বিরোধটি আলোচনার অন্যতম প্রধান বাধা। পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বেসামরিক কাজে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা যায়, কিন্তু উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রেও ব্যবহারযোগ্য। এ কারণে সমৃদ্ধকরণের মাত্রা, মজুতের পরিমাণ এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ রয়েছে।

রয়টার্সের ৭ অক্টোবরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার আগে ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ৪৪০ দশমিক ৯ কেজি ইউরেনিয়াম ছিল বলে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) হিসাব করেছিল। হামলার পর ওই মজুতের কতটা অক্ষত রয়েছে, তা নিশ্চিত নয়। ইরান ক্ষতিগ্রস্ত পরমাণু স্থাপনাগুলোতে আইএইএর পরিদর্শনও সীমিত করেছে। 

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত থাকা নিজে থেকেই প্রমাণ করে না যে কোনো দেশ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছে। তবে মজুতের পরিমাণ, সমৃদ্ধকরণের মাত্রা এবং পর্যবেক্ষণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ায়। ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির উদ্দেশ্য অস্বীকার করে আসছে।

যুদ্ধ বন্ধে সহায়তার প্রস্তাব পুতিনের

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার মধ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও কূটনৈতিক তৎপরতার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ৮ অক্টোবর তুর্কমেনিস্তানে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে পুতিন বলেন, সংঘাতের অবসানে সহায়তা করতে মস্কো যথাসাধ্য চেষ্টা করবে।

আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুতিন ইরানকে সংঘাত শেষ করার বাস্তব প্রচেষ্টা চালাতে দেখছেন বলেও মন্তব্য করেন। বৈঠকটি সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোর কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সম্মেলনের আগে অনুষ্ঠিত হয়। এর আগেও পুতিন ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টায় সহায়তার আগ্রহ জানিয়েছিলেন। 

রাশিয়ার এই অবস্থান ইরানের জন্য কূটনৈতিক সমর্থনের বার্তা। তবে মস্কোর বক্তব্য থেকে যুদ্ধ বন্ধে কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি বা বাস্তবায়নযোগ্য সমঝোতা নিশ্চিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মূল বিরোধগুলো এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন