মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৯ সালে হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, তা নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা জোরালো হচ্ছে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে ট্রাম্পের পরবর্তী সময়ে দলটির নেতৃত্ব ও নীতির দিকনির্দেশনা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে রিপাবলিকানদের।
রিপাবলিকান কৌশলবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এই বিতর্ক আরও তীব্র হবে। এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে রিপাবলিকানরা নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কতটা ধরে রাখতে পারে, তার ওপরও ভবিষ্যৎ আলোচনা অনেকাংশে নির্ভর করবে।
রিপাবলিকান কৌশলবিদ ও সাবেক কংগ্রেস নেতা ভিন ওয়েবার বলেন, ট্রাম্পের পর দলের নীতি ও গতিপথ নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক হবে। বিশেষ করে বাণিজ্যনীতি, শুল্ক এবং অর্থনীতিতে সরকারের ভূমিকা নিয়ে দলের ঐতিহ্যগত অবস্থানে ফেরা হবে কি না, সেটিই আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
ওয়েবারের মতে, ট্রাম্পের প্রতি আস্থা থেকেই অনেক রিপাবলিকান শুল্কনীতিকে সমর্থন করেছেন। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে রিপাবলিকান পার্টি শুল্কের পক্ষে ছিল না। তাঁর ভাষায়, শুল্ক বাণিজ্যবিরোধী এবং এটি এক ধরনের কর। একই সঙ্গে ট্রাম্পের বেসরকারি খাতে সরকারের হস্তক্ষেপ নিয়েও দলের সবাই সন্তুষ্ট নন।
দলের এক জ্যেষ্ঠ সিনেট কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর রিপাবলিকান পার্টিতে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হবে। তাঁর মতে, প্রায় এক দশক ধরে ট্রাম্পই দলটির প্রধান নেতা হিসেবে প্রভাব বিস্তার করছেন। তাই তাঁর পর দল কোন পথে যাবে, তা নিয়ে এখনই সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
কানাডার সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যযুদ্ধও রিপাবলিকানদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কানাডার পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকিকে মেইনের রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স ‘ভুল’ বলে মন্তব্য করেছেন। কানাডা সীমান্তবর্তী মেইন, মিশিগান ও আলাস্কায় আসন্ন সিনেট নির্বাচনেও এই নীতির প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে রয়টার্স/ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপে ট্রাম্পের অনুমোদনের হার তাঁর প্রেসিডেন্ট থাকার সময়ের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। তবে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘মাগা’ সমর্থকদের মধ্যে তাঁর সমর্থন এখনো ৯৫ শতাংশ। মাগা পরিচয় না দেওয়া রিপাবলিকানদের মধ্যে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের অনুমোদন ৫৯ শতাংশ এবং ৪০ শতাংশ তা অনুমোদন করেন না।
ট্রাম্প-পরবর্তী নেতৃত্বের প্রশ্নে সিনেটর টেড ক্রুজও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। তাঁর মতে, রিপাবলিকানরা এখনো ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে পুরোপুরি ঐক্যবদ্ধ হয়নি। ক্রুজ দলকে অর্থনৈতিকভাবে রক্ষণশীল ও মুক্তবাজারভিত্তিক নীতিতে ফেরানোর পক্ষে। বিশেষ করে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাভিত্তিক পপুলিজম ও শুল্কনীতির কিছু অংশ থেকে সরে আসার পক্ষে তিনি।
ট্রাম্পের পর দলের নেতৃত্বে সম্ভাব্য মুখ হিসেবে ভ্যান্স, ক্রুজ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর নাম আলোচনায় রয়েছে। ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসও ট্রাম্প-পরবর্তী সময়ে আবারও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন বলে রিপাবলিকান কৌশলবিদদের ধারণা।
সম্ভাব্য ২০২৮ সালের রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রাইমারি নিয়ে সাম্প্রতিক দুটি জরিপেও ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। ম্যাকলাফলিন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের আগস্টের জরিপে ভ্যান্স ৩২ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে ছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ১৯ শতাংশ, রুবিও ১২ শতাংশ এবং ডিস্যান্টিস ৬ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। অন্যদিকে মে মাসের অ্যাটলাসইনটেল জরিপে রুবিও ৪৫ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে ছিলেন; ভ্যান্সের সমর্থন ছিল ২৯ শতাংশ এবং ডিস্যান্টিসের ১১ শতাংশ।
অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক স্টিভেন এস স্মিথ মনে করেন, নভেম্বরের নির্বাচনের পর রিপাবলিকান নেতারা দলের প্রাইমারি ভোটারদের মধ্যে নিজেদের প্রভাব ও পরিচিতি বাড়াতে প্রতিযোগিতায় নামবেন। তাঁর মতে, ২০২৭ সালের শুরু থেকেই নেতৃত্বের এই প্রতিযোগিতা তীব্র হতে পারে।
ট্রাম্পের ব্যক্তিনির্ভর রাজনৈতিক অবস্থানও তাঁর উত্তরসূরির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। স্মিথের মতে, শুল্কনীতি কিংবা ইরান যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থান কোনো সুসংহত রাজনৈতিক মতাদর্শের চেয়ে তাঁর ব্যক্তিগত নেতৃত্বের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। ফলে এই রাজনৈতিক মডেল অন্য কোনো নেতার পক্ষে হুবহু অনুসরণ করা কঠিন।
দলের কিছু নেতা তাই সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের সময়কার নীতিতে ফেরার কথা বলছেন। ক্রুজের মতে, রিপাবলিকানদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কি বিশ্বের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নেওয়া একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী দল হবে, নাকি মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে বিশ্বে মার্কিন নেতৃত্ব বজায় রাখবে।
অর্থনীতিতেও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। উত্তর ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনীতিতে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, মুক্তবাজারের নীতির বদলে সরকার সরাসরি কিছু কোম্পানি ও ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। ইন্টেল, ইউএস স্টিল ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ খাতের কিছু কোম্পানিতে সরকারের বড় আর্থিক অংশীদারত্ব নিয়েও রিপাবলিকানদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে ভবিষ্যৎ নীতি ও নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়ে গেছে। ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি, শুল্ক, মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ-সবকিছু মিলিয়ে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে দলটি কোন পথে যাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সূত্র: দ্য হিল
ইরান যুদ্ধ অব্যাহত রাখলে চাপে পড়বে মার্কিন বাহিনী: মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী
'ইরানে পারমাণবিক হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র'
ইরানের 'খারগ দ্বীপে' হামলার ট্রাম্পের দাবি কী ভুয়া?
‘যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বোয়িং বিমান কিনবে বাংলাদেশ’
রুশ হামলায় ইউক্রেনে ধ্বংস এক কোটি ২০ লাখ বই