জার্মানিতে জেন-জি বিক্ষোভে সহিংসতা, দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৩০ এএম

শিক্ষার মানোন্নয়ন, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় কমানো এবং বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বিরোধিতা করে জার্মানির বিভিন্ন শহরে জেন-জি প্রজন্মের বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাতে দেশটির আর্থিক কেন্দ্র ফ্রাঙ্কফুর্টে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা কয়েকটি দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালান। এতে একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে বেগ পেতে হয়।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক প্রত্যক্ষদর্শী ফ্রাঙ্কফুর্টে অন্তত দুটি দোকানে লুটপাটের ঘটনা দেখেছেন। শহরটির পুলিশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানায়, সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে এবং কয়েকটি দোকানের জানালা ভাঙচুর করা হয়েছে। জরুরি সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটছে। এ পরিস্থিতিতে নগরীর কেন্দ্রীয় এলাকা এড়িয়ে চলতে সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ।

‘জেন-জি রেগেল্ট’ নামে একটি প্রচারগোষ্ঠীর উদ্যোগে জার্মানির ৩৪টি শহরে এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বার্লিন, ফ্রাঙ্কফুর্ট ও মিউনিখসহ বড় শহরগুলোতে হাজারো মানুষ এতে অংশ নেন। আয়োজকদের দাবি, বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বিরোধিতা, শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিতে তারা রাজপথে নেমেছেন। তাদের মতে, ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে তরুণ প্রজন্মের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে।

চলতি বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জেন-জি নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের যে ধারাবাহিকতা দেখা গেছে, জার্মানির এ কর্মসূচিও তার অংশ। সার্বিয়ায় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে আন্দোলন দেশটির দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন নেতাকে নির্বাচনে পরাজিত করতে ভূমিকা রেখেছিল। অন্যদিকে ফ্রান্সে বিক্ষোভের একপর্যায়ে দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।

আয়োজকেরা শুরুতে ১ লাখ ৮২ হাজার মানুষের অংশগ্রহণের প্রত্যাশা করেছিলেন। তবে শনিবার বিকেলে পাওয়া সরকারি হিসাব অনুযায়ী, উপস্থিতি ছিল প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। ফ্রাঙ্কফুর্ট, মিউনিখ ও বার্লিনের পুলিশ জানিয়েছে, এসব শহরে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার বিক্ষোভকারী জড়ো হয়েছিলেন। আয়োজকদের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা প্রায় ৩৬ হাজার অংশগ্রহণকারীর সংখ্যার অর্ধেক এই হিসাব।

জার্মান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হ্যালোইন উৎসবের সঙ্গে একই সময়ে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভগুলোর বেশির ভাগই শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো আন্দোলনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করতে পারে বলে সতর্ক করেছে তারা। হামবুর্গে কয়েকটি ব্যারিকেডে আগুন দেওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।

শনিবার বার্লিনের এক সমাবেশে ‘জেন-জি রেগেল্ট’-এর মুখপাত্র লিনা ফ্রিডরিখ বলেন, “আমরা যুদ্ধ ও জবরদস্তির পক্ষে নই, শান্তি ও স্বাধীনতার দাবিতে এখানে এসেছি।”

তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে আরও ভালো সহায়তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান দাবি। একই সঙ্গে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বিরোধিতা এবং দায়িত্বের ন্যায্য বণ্টনের পক্ষে তারা অবস্থান নিয়েছেন।

জার্মানির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির উগ্র বামপন্থী চরমপন্থিদের একাংশ এবং বিদেশি উগ্রপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি গোষ্ঠী বিক্ষোভের পক্ষে সমর্থন জোগাড়ের চেষ্টা করেছে।

হেসে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমান পোসেক ফ্রান্সের সাম্প্রতিক সহিংস বিক্ষোভের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, দোকানপাটে লুটপাট, বাড়িঘর ও পুলিশের গাড়িতে আগুন এবং পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার দৃশ্য সবার মনে আছে। এ ক্ষেত্রে ফ্রান্সকে কোনোভাবেই আদর্শ হিসেবে দেখা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কায় জার্মানির বিভিন্ন শহরে বেশ কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আগেভাগে দোকান বন্ধের পরিকল্পনা করে। অনেক প্রতিষ্ঠান জানালা ঢেকে রাখে। বার্লিনের অভিজাত কুরফুরস্টেনডাম বিপণিবিতান এলাকাতেও এমন সতর্কতামূলক প্রস্তুতি দেখা যায়।

ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জার্মানিতে তরুণদের ওপর ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপও আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। মিউনিখের সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী স্টিভের। চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, তরুণদের উদ্বেগের কোনো জবাব সরকার দেয়নি। বরং ব্যয় সংকোচন অব্যাহত রেখে তাদের ওপর আরও বোঝা চাপানো হচ্ছে।

স্টিভ বলেন, “আমাদের উপেক্ষা করা বন্ধ না করা পর্যন্ত আমরা সমাবেশ করার মৌলিক অধিকার প্রয়োগ করে যাব।”

জার্মানির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারে দীর্ঘদিন ধরেই নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পাশাপাশি অবসর গ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে এবং কর্মক্ষম জনসংখ্যা কমছে। ফলে পেনশন ও সরকারি সেবার ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

তবে আন্দোলনটির নেতৃত্ব কারা দিচ্ছে এবং এটি প্রকৃত অর্থেই তরুণদের নেতৃত্বাধীন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক সংগঠনও অংশ নিয়েছে। দেশটির জাতীয় স্কুল শিক্ষার্থী সংগঠন বিএসকে এ উদ্যোগ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছে। সংগঠনটি আগামী ২০ নভেম্বর আলাদা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা করেছে।

বার্লিনের কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শন বেকার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভবনগুলোর জরাজীর্ণ অবস্থা তুলে ধরতে শনিবারের বিক্ষোভে যোগ দেন। রয়টার্সকে তিনি বলেন, “ভবনের ভেতরের কক্ষগুলোতে ঢুকলে মনে হয় পরিত্যক্ত কোনো স্থাপনায় এসেছি। অথচ আমাদের নিয়মিত এখানেই পড়াশোনা করতে হয়।”

সূত্র: রয়টার্স

এমএজেড
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত