টানা ১৫ বছর পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় থাকার পর অবশেষে পতন হলো তৃণমূল কংগ্রেসের। ২০১১ সালে যে বামদুর্গ গুঁড়িয়ে দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় এসেছিলেন, ২০২৬ সালে এসে সেই একই পরিণতির শিকার হতে হলো তার দলকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলের ভেতরে ‘নবীন-প্রবীণ’ দ্বন্দ্ব এবং দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাদের অবহেলাই তৃণমূলের এই ভরাডুবির প্রধান কারণ।
যেভাবে পতনের শুরু
২০১১ সালের ২১ জুলাই শহিদ দিবসের মঞ্চে মমতার ভ্রাতুষ্পুত্র অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতিতে অভিষেক হয়। ২৪ বছরের সেই তরুণ নেতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। কিন্তু তার এই উত্থান দলের পুরনো ও প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি করে। ১৫ বছর পর আজ যখন দল ক্ষমতাচ্যুত, তখন এমন তথ্য উঠে আসছে মমতার তৈরি করা সেই শক্তিশালী ‘মিডল অর্ডার’ নেতাদের অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়াই ছিল বড় ভুল।
১৯৯৮ সালে তৃণমূল প্রতিষ্ঠার সময় মুকুল রায়, সুব্রত বক্সী, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম এবং শুভেন্দু অধিকারীদের মতো নেতারা ছিলেন মমতার প্রধান শক্তি। মমতা যখন ‘মুড়ি-তেলেভাজার’ রাজনীতি করতেন, তখন এই নেতারাই ছিলেন মাঠের সৈনিক। কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে দলে ‘কর্পোরেট’ সংস্কৃতি এবং আই-প্যাকের মতো পরামর্শদাতা সংস্থার দাপট বাড়লে প্রবীণ নেতারা কোণঠাসা হয়ে পড়েন।
সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের মতো বর্ষীয়ান নেতারাও আক্ষেপ করে বলেছিলেন, রাজনীতিতে ‘বাচ্চা ছেলেমেয়েদের’ লিখে দেয়া কাগজ দেখে বক্তব্য রাখা তাদের পক্ষে অসম্মানজনক। এই নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে অনেকেই দল ছেড়েছেন বা নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন।
দলের ভোট কৌশলী হিসেবে পরিচিত মুকুল রায় ২০১৭ সালে দল ছাড়লে তৃণমূলের সাংগঠনিক ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়। এরপর ২০২০ সালে শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপি-তে যোগ দেওয়া ছিল তৃণমূলের জন্য মরণকামড়। শুভেন্দু শুধু দলই ছাড়েননি, বরং নন্দীগ্রামে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে নিজের শক্তিমত্তা প্রমাণ করেছেন।
ব্যর্থ ‘নতুন তৃণমূল’ তত্ত্ব
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘নতুন তৃণমূল’ গড়ার ডাক দিয়েছিলেন এবং ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ ও নেতাদের অবসরের বয়সসীমা নির্ধারণের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ফিরহাদ হাকিমের মতো মমতার আস্থাভাজনদের ক্ষেত্রে এসব নিয়ম কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। একদিকে দুর্নীতির দায়ে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মতো নেতাদের পতন, অন্যদিকে নতুন নেতৃত্ব তৈরিতে ব্যর্থতা সব মিলিয়ে তৃণমূলের ‘ব্যাটিং অর্ডার’ পুরোপুরি ধসে পড়ে।
জনপ্রিয় প্রকল্প ও সাংগঠনিক ক্ষত
‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ বা ‘যুবসাথী’র মতো জনমুখী প্রকল্পগুলো সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করলেও দলের ভেতরের সাংগঠনিক ক্ষত সারাতে পারেনি। বিশ্লেষকদের মতে, মাঠপর্যায়ের নেতাদের গুরুত্ব কমিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর রাজনীতি করতে গিয়েই তৃণমূল সাধারণ মানুষের পালস বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। যার চূড়ান্ত ফল হিসেবে ২০২৬-এ এসে পশ্চিমবঙ্গ হারালো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বলছে, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুরের শক্ত ঘাঁটিতে পরাজিত হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর কাছে তিনি ১৫ হাজার ১০৫ ভোটে হেরেছেন। যদিও গত মার্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন যে তিনি একটি ভোটে হলেও তিনি ভবানীপুর আসনটি জিতবেন। কিন্তু ভোটগণনার পর শেষ পর্যন্ত সেই আশা পূরণ হয়নি।
অবশ্য সোমবার ভোটগণনা শুরু হওয়ার পর মমতা প্রথমদিকে শক্ত অবস্থানে ছিলেন। সপ্তম রাউন্ড শেষে তার লিড ছিল ১৭ হাজারেরও বেশি ভোট। তবে পরবর্তী রাউন্ডগুলোতে সেই ব্যবধান ধীরে ধীরে কমতে থাকে। একপর্যায়ে ১৪তম রাউন্ডে তা নেমে আসে চার হাজারের নিচে এবং শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যায়। সূত্র- আনন্দবাজার
বিজেপির জয়ের পর রণক্ষেত্র পশ্চিমবঙ্গ
যেসব কারণে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের বিপর্যয়
মুসলিমরা মমতাকে ভোট দিয়েছে, আমার জয় হিন্দুত্ববাদের 