২৫ বছর পর দেশে ফিরলেন উখিয়ার ফরিদ

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪৩ পিএম

অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ভারত হয়ে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন দশ বছর বয়সি মোহাম্মদ ফরিদ। জীবিকার সন্ধানে পাকিস্তানে থাকার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে দুই পা হারান তিনি। পরে উন্নত জীবন ও চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানব পাচারকারী চক্র তাকে তুরস্কে নিয়ে যায়।

এরপর দীর্ঘ ২৫ বছর ফরিদের কোনো খোঁজ না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা ধরে নিয়েছিলেন, তিনি আর বেঁচে নেই। তবে সবাইকে চমকে দিয়ে অবশেষে দেশে ফিরেছেন ফরিদ।

ফরিদের বাড়ি কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার মরিচ্যা পালং নাছির পাড়ায়। গত ১৮ আগস্ট ভোর সোয়া ৫টার দিকে তুরস্ক থেকে একটি ফ্লাইটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি।

শৈশবেই দেশ ছাড়ায় দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরে নিজের পরিচয়ও ঠিকমতো দিতে পারছিলেন না ফরিদ। শুধু নিজের ও মা-বাবার নাম এবং ‘উখিয়া, কক্সবাজার’ -এটুকুই বলতে পারছিলেন তিনি।

বিমানবন্দরের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) এভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক) সদস্যরা তাকে প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে ব্র্যাকের আশকোনা মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে হস্তান্তর করেন।

এরপর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের সহায়তায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মীরা মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে উখিয়ার মরিচ্যা পালং নাছির পাড়ায় ফরিদের পরিবারের সন্ধান পান। পরিবারের সন্ধান পাওয়ার পর গত বুধবার বিকেলে ভিডিও কলে ফরিদের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেয়া হয় তার ছোট ভাই সৈয়দ আলমের। দীর্ঘ ২৫ বছর পর ভাইয়ের কণ্ঠ শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।

পরে ফরিদের একটি বিশেষ শারীরিক বৈশিষ্ট্যও তার পরিচয় নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তার একটি হাতে পাঁচটির পরিবর্তে ছয়টি আঙুল রয়েছে। বাড়তি সেই আঙুল দেখে পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত হন, ফিরে আসা মানুষটি তাদেরই ফরিদ।

ফরিদের ছোট ভাই সৈয়দ আলম উখিয়ার একটি স্থানীয় মসজিদের ইমাম। তিনি বলেন, ‘আমরা ধরে নিয়েছিলাম, ফরিদ ভাই আর বেঁচে নেই। কিন্তু এত বছর পর তাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ আমরা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।’

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম সূত্রে জানা গেছে, পাকিস্তানে থাকার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে গুরুতর আহত হন ফরিদ। চিকিৎসকদের তার দুই পা কেটে ফেলতে হয়। এরপর মানব পাচারকারী একটি চক্র উন্নত জীবন ও চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাকে ইউরোপে নেয়ার কথা বলে। একপর্যায়ে তাকে তুরস্কে নিয়ে যাওয়া হয়। তুরস্কে ফরিদ সমুদ্রতীরে পানি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন। সেখানে তিনি অনিয়মিত অভিবাসী হিসেবে বসবাস করছিলেন। সম্প্রতি দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে আটক করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়।

ফরিদের পরিবার জানিয়েছে, তার বাবা আয়ুব আলী এখনো পাকিস্তানে রয়েছেন। দীর্ঘ ২৫ বছর পর দেশে ফিরে ফরিদ এখন বৃদ্ধ মা নুরজাহান বেগমের কাছে।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, গত আট বছরে বিমানবন্দরে ৪১ হাজার প্রবাসীকে সহায়তা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ফরিদের মতো ১৬৪ জনকে তাদের পরিবারের কাছে নিরাপদে হস্তান্তর করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘১৭ কোটি মানুষের দেশে কাউকে খুঁজে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া কঠিন কাজ। কিন্তু সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, প্রবাসীকল্যাণ ডেস্ক ও ব্র্যাকের সমন্বিত উদ্যোগে এমন অসম্ভবকেও সম্ভব করা গেছে।’

ফরিদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার উদ্যোগ নেয়ার কথাও জানান তিনি, যাতে দেশে ফিরে নতুন করে জীবন গুছিয়ে নিতে পারেন ফরিদ।

এদিকে ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের রেইজ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও সরকারের যুগ্ম সচিব এ টি এম মাহবুবুল করিম জানিয়েছেন, মোহাম্মদ ফরিদকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হবে।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের উপপরিচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, প্রবাসীরা বিভিন্ন সময় নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রবাসীকল্যাণ ডেস্ক তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে।

MCH
আরও পড়ুন