বিষণ্নতায় হারাতে পারে মস্তিষ্কের নিউরন তৈরির ক্ষমতা 

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫২ এএম

বিষণ্নতার কারণে মস্তিষ্কের নতুন নিউরন বা স্নায়ুকোষ তৈরির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ভ্যাগেলোস কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনসের নতুন এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।

মানুষের মস্তিষ্কে প্রায় ১০০ বিলিয়ন নিউরন রয়েছে, যার অধিকাংশই জন্মের আগেই তৈরি হয়। তবে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে অল্পসংখ্যক নতুন নিউরন তৈরি হতে থাকে। গবেষকদের ধারণা, বিষণ্নতা থেকে মস্তিষ্ককে সুরক্ষিত রাখা এবং মানসিক চাপের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এসব নতুন নিউরন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষণাটি প্রথমবারের মতো এমন প্রমাণ দিয়েছে যে মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের মস্তিষ্কে নতুন নিউরন তৈরির প্রক্রিয়া বা নিউরোজেনেসিস কার্যত স্থবির হয়ে যেতে পারে। গবেষকেরা একই সঙ্গে এই প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে জড়িত বিভিন্ন আণবিক কার্যক্রমও শনাক্ত করেছেন। যা ভবিষ্যতে বিষণ্নতার নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবনের সম্ভাব্য পথ দেখাতে পারে।

গবেষণাটির নেতৃত্ব দেওয়া কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির মনোরোগবিদ্যার অধ্যাপক মওরা ডুপন্ট বলেন, অতীতে বিষণ্নতাকে মূলত সেরোটোনিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটারের ঘাটতিজনিত রোগ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু এখন বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, বিষণ্নতার পেছনে একাধিক জৈবিক পরিবর্তন কাজ করে। এসব পরিবর্তন মস্তিষ্কের নিউরনকে মানসিক চাপ ও পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

তার মতে, নতুন নিউরন তৈরির ক্ষমতা হারালে বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা পরিবেশের সঙ্গে কার্যকরভাবে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয় মানসিক স্থিতিস্থাপকতা হারাতে পারেন।

স্মৃতি ও আবেগে নতুন নিউরনের ভূমিকা

গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে হিপোক্যাম্পাসকে। মস্তিষ্কের এই অংশ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার স্মৃতি বা এপিসোডিক মেমোরি সংরক্ষণ এবং পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত আবেগীয় প্রতিক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রাপ্তবয়স্ক মস্তিষ্কের অল্প কয়েকটি অংশের মধ্যে হিপোক্যাম্পাস অন্যতম, যেখানে নতুন নিউরন তৈরি হতে থাকে।

বিষণ্নতার সঙ্গে হিপোক্যাম্পাসের পরিবর্তনের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চলছে। কারণ স্মৃতি ও আবেগ—দুই ক্ষেত্রেই এই অংশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গবেষকদের ধারণা, হিপোক্যাম্পাসের পরিবর্তনের কারণে বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা বিভিন্ন অভিজ্ঞতাকে তুলনামূলকভাবে নেতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতায় ভুগতে পারেন।

ডুপন্ট বলেন, একই ধরনের কিন্তু আলাদা দুটি স্মৃতি পরস্পর থেকে আলাদা করে চেনা এবং অতীতের কোনো ঘটনার সঙ্গে যুক্ত আবেগকে বর্তমান পরিস্থিতির আবেগ থেকে পৃথক রাখার ক্ষেত্রে হিপোক্যাম্পাস গুরুত্বপূর্ণ।

এই সক্ষমতাকে বলা হয় ‘প্যাটার্ন সেপারেশন’। এটি দুর্বল হয়ে গেলে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও সেগুলোর সঙ্গে যুক্ত আবেগ পরস্পরের সঙ্গে মিশে যেতে পারে।

গবেষকেরা একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। ধরুন, আপনি কোনো বন্ধুর সঙ্গে দুপুরের খাবার খেতে গেলেন। সে ক্লান্ত থাকায় খুব বেশি কথা বলল না। স্বাভাবিক অবস্থায় আপনি এটিকে একটি স্বতন্ত্র ঘটনা হিসেবে মনে রাখবেন। কিন্তু প্যাটার্ন সেপারেশন দুর্বল হলে এই অভিজ্ঞতা অতীতে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার স্মৃতির সঙ্গে মিশে যেতে পারে। তখন আপনার মনে হতে পারে, ‘সে হয়তো আমার ওপর বিরক্ত।’

গবেষকেরা বলছেন, বিষণ্নতায় আক্রান্ত অনেক মানুষের মধ্যে এমন প্রবণতা দেখা যায়—তারা স্মৃতি থেকে ইতিবাচক অভিজ্ঞতার চেয়ে নেতিবাচক তথ্যই বেশি মনে করতে পারেন।

ইঁদুরের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, প্যাটার্ন সেপারেশনের জন্য প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় নতুন নিউরন তৈরি হওয়া প্রয়োজন। মস্তিষ্কের টিউমারে আক্রান্ত কিছু রোগীর ওপর করা সাম্প্রতিক একটি গবেষণাও ইঙ্গিত দিয়েছে, মানুষের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সম্পর্ক থাকতে পারে।

নতুন নিউরন তৈরির প্রক্রিয়া চালু করা কি সম্ভব?

গবেষকেরা এখনো নিশ্চিতভাবে জানেন না, মানুষের ক্ষেত্রে ঠিক কীভাবে নতুন নিউরন প্যাটার্ন সেপারেশনকে শক্তিশালী করে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, নতুন নিউরনগুলো নতুন অভিজ্ঞতার প্রতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল। একই সঙ্গে এগুলো নতুন স্মৃতির সার্কিটে সহজে যুক্ত হতে পারে। ফলে পুরোনো স্মৃতি ও নতুন স্মৃতি আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।

ডুপন্টের মতে, কোনো কোনো মানুষের ক্ষেত্রে নিউরোজেনেসিস বা নতুন নিউরন তৈরির প্রক্রিয়া পুনরায় সক্রিয় করা ভবিষ্যতে বিষণ্নতার চিকিৎসার একটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে। এর মাধ্যমে হিপোক্যাম্পাসের স্নায়বিক সার্কিটে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা সম্ভব হতে পারে।

বিষণ্নতার প্রভাব শুধু নিউরন তৈরিতে সীমাবদ্ধ নয়

গবেষণায় দেখা গেছে, বিষণ্নতার সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তন শুধু নতুন নিউরন তৈরির প্রক্রিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। হিপোক্যাম্পাসের যে বৃহত্তর স্নায়বিক সার্কিট এপিসোডিক স্মৃতি ও তার সঙ্গে যুক্ত আবেগ সংরক্ষণ করে, সেখানেও ব্যাপক আণবিক পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

প্রভাবিত জিনগুলোর মধ্যে এমন জিন রয়েছে, যেগুলো নিউরনের মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরিতে, মস্তিষ্কের কোষগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগে, কোষে শক্তি সরবরাহে এবং কোষের ভেতরে বিভিন্ন উপাদান পরিবহনে ভূমিকা রাখে।

এ ছাড়া হিপোক্যাম্পাসের নতুন আবেগীয় স্মৃতি তৈরির প্রধান পথ হিসেবে পরিচিত ‘ট্রাইসিন্যাপটিক সার্কিট’-এ বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রদাহ ও কোষীয় চাপেরও প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এসব পরিবর্তন শনাক্ত করতে গবেষকেরা বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তি এবং নিয়ন্ত্রণ দলের মানুষের মৃত্যুর পর সংগৃহীত প্রায় ৫ লাখ মস্তিষ্কের কোষ পরীক্ষা করেন। আধুনিক বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিটি কোষে কোন জিন কতটা সক্রিয় এবং কোষীয় প্রোটিনে কোনো পরিবর্তন ঘটেছে কি না, তা বিশ্লেষণ করা হয়।

বিপুল এই তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে গবেষকেরা পৃথক কোষের কার্যক্রম এবং হিপোক্যাম্পাসের কোন অংশে পরিবর্তিত কোষগুলো অবস্থান করছে, তা বিস্তারিতভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হন।

জিন, পরিবেশ ও বিষণ্নতার যোগসূত্র

গবেষণায় এমন কয়েকটি জিনের কার্যক্রমে পরিবর্তন পাওয়া গেছে, যেসব জিনের জিনগত বৈচিত্র্যের সঙ্গে আগে থেকেই মেজর ডিপ্রেশনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে কিছু জিনে ‘এপিজেনেটিক’ পরিবর্তনও দেখা গেছে। এসব পরিবর্তন পরিবেশগত প্রভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এপিজেনেটিক প্রক্রিয়া ডিএনএর মূল কাঠামো পরিবর্তন না করেই কোনো জিন কতটা সক্রিয় হবে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

ডুপন্ট এই প্রক্রিয়াকে জিনের ‘ডিমার সুইচ’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা—যেমন মানসিক চাপ, শেখার অভিজ্ঞতা, বয়স বাড়া কিংবা বিভিন্ন রাসায়নিকের প্রভাব—এসব সুইচের মাধ্যমে জিনের কার্যক্রমে পরিবর্তন আনতে পারে।

গবেষকদের মতে, বিষণ্নতার ক্ষেত্রে এত বৈচিত্র্যময় আণবিক পরিবর্তন পাওয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে পারে কেন একেকজন মানুষের মধ্যে এই রোগের লক্ষণ ও অভিজ্ঞতা একেক রকম হয়।

ডুপন্ট বলেন, গবেষণায় পাওয়া বিস্তৃত পরিবর্তনগুলো বিষণ্নতার বিভিন্ন জৈবিক কারণ বা প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে। অর্থাৎ বিষণ্নতা হয়তো একক কোনো রোগ নয়; এর পেছনে একাধিক ভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়া কাজ করতে পারে।

বিষণ্নতার নতুন শ্রেণিবিন্যাসের ভাবনা

গবেষকেরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে বিষণ্নতাকে এর আণবিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা সম্ভব হবে। ক্যানসারের ক্ষেত্রে যেমন শুধু আক্রান্ত অঙ্গের ভিত্তিতে নয়, কোষের বৈশিষ্ট্য ও আণবিক পরিবর্তনের ভিত্তিতে রোগের ধরন নির্ধারণ করা হচ্ছে, বিষণ্নতার ক্ষেত্রেও তেমন ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে।

গবেষকদের লক্ষ্য হলো বিষণ্নতার আণবিক বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করে রোগটিকে নতুনভাবে শ্রেণিবিন্যাস করা। এর ফলে রোগের নির্দিষ্ট জৈবিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আরও কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

‘ডিসরেগুলেটেড অ্যাডাল্ট হিপোক্যাম্পাল নিউরোজেনেসিস ইন মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার্স’ শীর্ষক গবেষণাটি ২১ আগস্ট ২০২৬-এ Nature Medicine সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি আরভিং মেডিকেল সেন্টার ও নিউইয়র্ক স্টেট সাইকিয়াট্রিক ইনস্টিটিউটে। গবেষণার বিভিন্ন পর্যায়ে জিন সিকোয়েন্সিং, কম্পিউটেশনাল বিশ্লেষণ ও প্রোটিওমিকসসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।

এমএজেড
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত