বুলগেরীয় সাংবাদিক মার্কভ'র মৃত্যুর নেপথ্যে কেজিবি'র বিষমাখা ছাতা?

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৫ পিএম

লন্ডনের ব্যস্ত সড়কে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন বুলগেরীয় সাংবাদিক ও লেখক জর্জি মার্কভ। হঠাৎ পায়ে অনুভব করলেন তীব্র এক খোঁচা। পেছনে তাকিয়ে দেখলেন এক ব্যক্তি ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। লোকটি ক্ষমা চেয়ে দ্রুত সরে গেলেন। সেই সামান্য খোঁচার আড়ালেই যে লুকিয়ে ছিল প্রাণঘাতী বিষ, তা তখনও জানতেন না মার্কভ।

১৯৭৮ সালের ৭ সেপ্টেম্বর মধ্য লন্ডনের ওয়াটারলু ব্রিজের একটি বাসস্টপে এ ঘটনা ঘটে। ৪৯ বছর বয়সী মার্কভকে ছাতা দিয়ে আঘাত করার চার দিন পর হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। প্রথমে চিকিৎসকেরা রক্তে বিষক্রিয়াকে মৃত্যুর কারণ বলে ধারণা করেছিলেন। কিন্তু দ্রুতই তদন্তকারীদের সামনে আসতে থাকে এক ভয়ংকর রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের চিত্র।

মার্কভের উরু থেকে উদ্ধার করা হয় পিনের মাথার চেয়েও ছোট একটি ধাতব বস্তু। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা মাইক্রোস্কোপে পরীক্ষা করে দেখতে পান, সেটি ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তৈরি একটি পেলেট। এতে চারটি ক্ষুদ্র ছিদ্র ছিল, যেখানে অতি সামান্য পরিমাণ প্রাণঘাতী বিষ রাখা হয়েছিল বলে ধারণা করেন তারা।

ব্রিটেনের গোপন রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্র গবেষণা প্রতিষ্ঠান পোর্টন ডাউনের বিজ্ঞানীরা পরে ধারণা করেন, মার্কভকে হত্যায় ব্যবহার করা হয়েছিল অত্যন্ত প্রাণঘাতী বিষ রিসিন। সে সময় ব্রিটেনে হত্যাকাণ্ডে এ বিষ ব্যবহারের নজির ছিল না।

তদন্ত আরও নাটকীয় মোড় নেয় যখন একই ধরনের হামলার শিকার আরেক বুলগেরীয় নির্বাসিতের সন্ধান পাওয়া যায়। মার্কভ হত্যার প্রায় ১০ দিন আগে প্যারিসের মেট্রো থেকে বের হওয়ার সময় ভ্লাদিমির কোস্তভ পিঠে তীব্র ব্যথা অনুভব করেছিলেন। এরপর তিন দিন জ্বরে ভুগলেও তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।

মার্কভের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর কোস্তভ পিঠের এক্স-রে করান। তাতে ধরা পড়ে ক্ষুদ্র একটি ধাতব পেলেট। অস্ত্রোপচারের সময় ফরাসি এক সার্জন সেটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে শরীর থেকে বের করেন। পরে পেলেটটি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে পাঠানো হয়।

পরীক্ষায় দেখা যায়, কোস্তভের শরীর থেকে পাওয়া পেলেট এবং মার্কভের উরু থেকে উদ্ধার করা পেলেট প্রায় অভিন্ন। দুটির ওজন একই ছিল, ছিদ্রগুলোর অবস্থানও একই। উভয় পেলেটই তৈরি হয়েছিল বিরল প্লাটিনাম-ইরিডিয়াম সংকর ধাতু দিয়ে, যা মানবদেহ সহজে প্রত্যাখ্যান করে না।

পোর্টন ডাউনের পরীক্ষায় কোস্তভের শরীরে রিসিনের অ্যান্টিবডিও পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পেলেটে বিষের পরিমাণ কম থাকায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান।

ঘটনার তদন্তে আরও উঠে আসে, মার্কভকে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে তার পরিবার আগেই সতর্কবার্তা পেয়েছিল। মার্কভের স্ত্রী অ্যানাবেল জানান, ১৯৭৮ সালের মে মাসে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি তার স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। ওই ব্যক্তি দাবি করেছিলেন, বুলগেরিয়ার সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায় থেকে মার্কভকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মার্কভের বড় ভাই নিকোলাইও জানান, ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি একই ধরনের একটি ফোন পেয়েছিলেন। তাকে বলা হয়েছিল, জর্জিকে কোনো চিহ্ন না রেখে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং পশ্চিম ইউরোপে এরই মধ্যে বিষ বা কোনো জীবাণু পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

মার্কভ কেন এমন টার্গেটে পরিণত হয়েছিলেন, তার উত্তরও ছিল তার কর্মকাণ্ডে। ১৯৬৯ সালে কমিউনিস্ট শাসিত বুলগেরিয়া থেকে পালিয়ে যুক্তরাজ্যে বসতি গড়েন তিনি। পরে বিবিসির ওয়ার্ল্ড সার্ভিস ও রেডিও ফ্রি ইউরোপে কাজ করে বুলগেরীয় সরকারের কড়া সমালোচক হয়ে ওঠেন।

তার সাপ্তাহিক সম্প্রচারে বুলগেরিয়ার ক্ষমতাসীন মহলের জীবনযাপন, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা তথ্য উঠে আসত। বিশেষ করে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট তোদোর ঝিভকভকে নিয়ে তার ধারাবাহিক অনুষ্ঠান সরকারের ক্ষোভের কারণ হয়েছিল বলে পরে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।

তদন্তকারীদের কাছে মার্কভ হত্যার ধরনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বুলগেরিয়ার তৎকালীন গোয়েন্দা সংস্থা দারঝাভনা সিগুরনস্তের সাবেক এক কর্মকর্তা দাবি করেছিলেন, সংস্থাটির প্রতিটি বিভাগেই সোভিয়েত কেজিবির একজন করে উপদেষ্টা থাকতেন। তার মতে, মস্কোর অজ্ঞাতে এমন অভিযান চালানো প্রায় অসম্ভব ছিল।

কেজিবির একটি হত্যাদল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সাবেক কর্মকর্তা নিকোলাই খোখলোভও বলেছিলেন, ব্যবহৃত প্রযুক্তি ছিল অত্যন্ত জটিল। তার মতে, এমন একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পেছনে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাউকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা ছিল।

পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর জানা যায়, কেজিবি এমন একটি ছাতা তৈরি করেছিল, যার সাহায্যে শরীরে রিসিনভর্তি পেলেট প্রবেশ করানো সম্ভব ছিল। পরে কেজিবির দুই সাবেক কর্মকর্তা দাবি করেন, মার্কভ হত্যায় সংস্থাটি সহায়তা করেছিল। তবে হত্যাকাণ্ডটি ইতালীয় এক অপরাধী বাস্তবায়ন করেছিল বলে তাদের বক্তব্যে উঠে আসে।

মার্কভ হত্যার রহস্যের আনুষ্ঠানিক সমাধান অবশ্য আজও হয়নি। কাউকে এ হত্যার জন্য কখনো অভিযুক্ত করা যায়নি। পর্যাপ্ত সন্দেহভাজন না পাওয়ায় ২০১৩ সালে বুলগেরিয়া মামলাটি বন্ধ করে দেয়। তবে যুক্তরাজ্যে তদন্ত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে খোলা রয়েছে।

মার্কভ হত্যার ঘটনা শুধু একজন নির্বাসিত সাংবাদিককে নিশ্চুপ করার অভিযোগেই থেমে থাকেনি। সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা খোখলোভের ভাষায়, এর আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমে অবস্থানরত ভিন্নমতাবলম্বীদের মনে ভয় তৈরি করা, দূরত্ব, পশ্চিমা নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিংবা বিদেশের মাটিও যে তাদের রক্ষা করতে পারবে না, সেই বার্তা দেওয়া। সূত্র: বিবিসি

এএস
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত