সিএনএন এর বিশ্লেষণ

হুথিদের মোকাবিলায় সৌদির সামনে খুব বেশি বিকল্প নেই

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৫ পিএম

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিদের দ্রুত অগ্রগতি এবং সৌদি আরবে ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে রিয়াদ। হুথিদের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সৌদি আরবের সামনে এখন খুব বেশি বিকল্প নেই। যে পথই বেছে নিক, তার সঙ্গে বড় ধরনের রাজনৈতিক, সামরিক ও আঞ্চলিক ঝুঁকি জড়িয়ে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের মূল বার্তা এখনো হলো তারা সর্বাত্মক যুদ্ধে যেতে চায় না। কিন্তু ইয়েমেনে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি এবং সৌদি ভূখণ্ডে হামলা পরিস্থিতিকে এমন জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে বড় ধরনের পাল্টা হামলার সম্ভাবনা প্রতিদিনই বাড়ছে। ইয়েমেন ও ওয়াশিংটনভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-বাশা বলেছেন, পরিস্থিতির সব লক্ষণই বড় ধরনের সৌদি পাল্টা হামলার দিকে ইঙ্গিত করছে।

চলতি সপ্তাহে হুথিরা লোহিত সাগরের মুখে কৌশলগত পেরিম দ্বীপ এবং বন্দরনগরী মোখা দখল করেছে। এর মধ্য দিয়ে বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা আরও জোরদার হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর কিছু সময় পর ইরাক থেকে উড়ে আসা ড্রোনের হামলায় সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যায়। হামলার দায় কোনো পক্ষ স্বীকার করেনি। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর জন্য তেহরানকে দায়ী করেছেন।

ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের ব্যবহার বাড়িয়েছে। পারস্য উপসাগরে অপেক্ষমাণ তেলবাহী জাহাজের জন্য নির্ধারিত দৈনিক প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল এই পাইপলাইনের মাধ্যমে অন্য পথে পাঠানো হচ্ছে। ফলে পাইপলাইনে হামলা সৌদি আরবের জন্য আরও উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত মাসের শুরুতেই সৌদির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সতর্ক করেছিলেন, ইরান-সমর্থিত হুথিদের সঙ্গে ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সমন্বিতভাবে একাধিক হামলা চালাতে পারে।

বাহ্যিকভাবে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে শক্তির ব্যবধান বিশাল। একদিকে বিপুল সম্পদ ও আধুনিক সামরিক সরঞ্জামে সজ্জিত সৌদি আরব, অন্যদিকে দরিদ্র ইয়েমেনের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। কিন্তু বাস্তবে হুথিদের সরিয়ে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন প্রমাণিত হয়েছে। বহু বছর ধরে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও যুদ্ধকৌশল উন্নত করেছে গোষ্ঠীটি।

হুথিরা ইরানের সঙ্গে মিত্র হলেও তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক লক্ষ্যও রয়েছে। গোষ্ঠীটির মূল দাবির মধ্যে রয়েছে উত্তর ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ হুথি-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের ওপর সৌদি আরবের অবরোধ ও বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা বন্ধ করা। হুথি-নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার প্রধান নাসর আল-দীন আমের বলেছেন, সৌদি আরবের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে তারা, যতক্ষণ না সৌদি অবরোধ প্রত্যাহার করে।

সৌদি আরবের সামনে প্রথম বড় বিকল্প হলো সরাসরি সামরিক অভিযান জোরদার করা। ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের বিশ্লেষক চিনজিয়া বিআঙ্কোর মতে, সৌদি আরবের হাতে বিকল্প খুবই সীমিত। রিয়াদ যদি সর্বশক্তি নিয়ে হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে, তাহলে ইয়েমেনে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের মতো আরেকটি সংঘাত তৈরি হতে পারে।

এ ধরনের সর্বাত্মক সংঘাত শুধু ইয়েমেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা কম। সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হলে ইরানও এতে জড়িয়ে পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে ইয়েমেনের সংঘাত বৃহত্তর মার্কিন-ইরান যুদ্ধেরই একটি অধ্যায়ে পরিণত হতে পারে এবং সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

অন্যদিকে, সৌদি আরবের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক সহায়তা পাওয়াও নিশ্চিত নয়। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান সংকট, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক সম্পদ ব্যবহারের বিষয়ে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিতর্কের কারণে ওয়াশিংটন হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিকভাবে জড়াতে অনাগ্রহী বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। ট্রাম্প প্রশাসনকে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর জন্য সৌদি চাপও দেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে পুরোপুরি ছেড়ে দেয়নি। হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি সামরিক অভিযানে গোয়েন্দা সহায়তা দিতে প্রায় ১০০ মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা পাঠানো হয়েছে বলে সিএনএন জানিয়েছে। সাবেক সৌদি সরকারি উপদেষ্টা নাওয়াফ ওবায়েদ অবশ্য বলেছেন, সৌদির অনুরোধ ছিল মার্কিন বিমান হামলার জন্য নয়, বরং গোয়েন্দা সহায়তার জন্য।

সৌদি আরবের দ্বিতীয় বিকল্প রাজনৈতিক সমঝোতার পথ খোঁজা। কিন্তু সেই পথও ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। গত কয়েক মাসে রিয়াদ হুথি ও ইরানের বিরুদ্ধে বারবার সতর্কতা ও নিন্দা জানিয়ে ‘কৌশলগত ধৈর্য’ দেখিয়েছে। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে হামলার পরপরই জানিয়েছিল, তারা আপাতত পাল্টা ব্যবস্থা না নিয়ে ইরাক সরকারের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করছে। একই সঙ্গে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সংরক্ষণের কথাও জানিয়েছিল।

বিশ্লেষক বিআঙ্কোর মতে, রাজনৈতিক সমাধানের পথেও সৌদি আরব প্রায় সব সুযোগ শেষ করে ফেলেছে। এমনকি হুথিদের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হলেও তার মূল্য রিয়াদের জন্য অনেক বেশি হতে পারে। আল-বাশার মতে, সেই সমঝোতা হুথিদের দাবির কাছে প্রায় সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের সমান হতে পারে।

ফলে হুথিদের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং সৌদি আরবের পাল্টা প্রতিক্রিয়া এখন পুরো অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সৌদি আরব কবে এবং কী ধরনের জবাব দেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, রিয়াদের পরবর্তী পদক্ষেপের প্রভাব শুধু ইয়েমেন বা সৌদি সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতেও পড়তে পারে। সূত্র: সিএনএন

এএস
আরও পড়ুন