রাশিয়া-ইউক্রেনের জরুরি সতর্কতা অ্যাপে সাইবার হামলা

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:০৫ এএম

রাশিয়া ও ইউক্রেনের জরুরি সতর্কতা দেওয়ার মোবাইল অ্যাপে সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে দুই দেশের ব্যবহারকারীদের কাছে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক হামলাসংক্রান্ত ভুয়া সতর্কবার্তা। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলেও মিথ্যা বার্তা পাঠানো হয়। ঘটনাটি নিয়ে দুই দেশই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে হামলার পেছনে কারা রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ইউক্রেনের বিমানবাহিনী দ্রুত এক বার্তায় জানায়, দেশটির ‘এয়ার অ্যালার্ট’ অ্যাপে শত্রুপক্ষের হস্তক্ষেপ হয়ে থাকতে পারে। কিয়েভে তেজস্ক্রিয়তার কোনো ঝুঁকি নেই উল্লেখ করে নাগরিকদের শান্ত থাকার এবং পরবর্তী নির্দেশনার জন্য তাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করার আহ্বান জানানো হয়।

ইউক্রেনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশনস এক্সে দেওয়া পোস্টে এ ঘটনার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করেছে। সংস্থাটি অ্যাপে আসা অস্বাভাবিক বার্তা উপেক্ষা করার জন্য নাগরিকদের সতর্ক করে। তাদের প্রকাশিত একটি ছবিতে অ্যাপে দেখা দেওয়া কয়েকটি ভুয়া সতর্কবার্তার নমুনাও তুলে ধরা হয়।

ইউক্রেনের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাও জানায়, ‘এয়ার অ্যালার্ট’ অ্যাপে ত্রুটি দেখা দিয়েছে। বিমান হামলার ঝুঁকি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে নাগরিকদের বিকল্প তথ্যসূত্র ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। ইউক্রেনের ডিজিটাল রূপান্তর মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় পরিচালিত অ্যাপটি সাধারণত সামরিক সতর্কতা জারি ও প্রত্যাহারের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারকারীদের জানায়।

রাশিয়ার অ্যাপেও পারমাণবিক হামলার ভুয়া সতর্কবার্তা

ইউক্রেনের ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর রাশিয়াও জানায়, তাদের জরুরি সতর্কতা দেওয়ার মোবাইল অ্যাপে বড় ধরনের সাইবার হামলা হয়েছে। দেশটির অ্যাপে পাঠানো একটি ভুয়া বার্তায় দাবি করা হয়, ইউক্রেনের ‘পি১-সানস’ নামের হামলাকারী ড্রোনে পারমাণবিক ওয়ারহেড বসিয়ে রাশিয়ার সব অঞ্চলে হামলা চালানো হয়েছে।

বার্তাটিতে নাগরিকদের তিন সপ্তাহের খাবার মজুত করে নিরাপদ স্থানে লুকিয়ে থাকার নির্দেশও দেওয়া হয়। তবে এসব সতর্কবার্তা ছিল ভুয়া।

রাশিয়ার জরুরি পরিস্থিতি মন্ত্রণালয় জানায়, মোবাইল অ্যাপটি সাময়িকভাবে অচল থাকলেও দেশটির সামগ্রিক জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে। সাইরেন, মাইক, খুদে বার্তা, টেলিভিশন ও রেডিওর মাধ্যমে নাগরিকদের সতর্ক করা হচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, মোবাইল অ্যাপটি মূল সতর্কতা ব্যবস্থার বিকল্প নয়, বরং অতিরিক্ত তথ্য সরবরাহের একটি মাধ্যম। অ্যাপে সাইবার হামলার কারণে দেশের সামগ্রিক সতর্কতা ব্যবস্থায় কোনো প্রভাব পড়েনি। বিশেষজ্ঞরা অ্যাপটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে কাজ করছেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ভবিষ্যতে আরও সাইবার হামলার আশঙ্কা

ইউক্রেনের সতর্কতা অ্যাপে হামলার ঘটনাকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইবার নীতি ও নিরাপত্তাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক হার্বার্ট লিন। বিবিসির নিউজডে অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ইউক্রেনের সরকারি কোনো তথ্যভিত্তিক অ্যাপে এ ধরনের ঘটনা সম্ভবত প্রথম। তবে ভবিষ্যতে এমন হামলা আবারও হতে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাইবার নিরাপত্তা উন্নয়নবিষয়ক কমিশনেও দায়িত্ব পালন করেছেন লিন। তিনি বলেন, হামলাকারীরা কীভাবে অ্যাপে প্রবেশ করেছে, তা এখনো জানা যায়নি। ভবিষ্যতে তারা আরও বড় পরিসরে এমন হামলা চালাতে সক্ষম হবে কি না, সেটিও এখনই বলা সম্ভব নয়।

দুই দেশের জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টাপাল্টি হামলা

সাইবার হামলার পাশাপাশি রাশিয়া ও ইউক্রেন একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

রাশিয়ার দাবি, রাজধানী মস্কোর পূর্বাঞ্চলে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে রাতভর ড্রোন হামলা হয়েছে। ইউক্রেনের সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটিকে রাশিয়ার নিজনি নভগোরোদ অঞ্চলের কস্তোভো তেল শোধনাগার হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

অঞ্চলটির গভর্নর গ্লেব নিকিতিন হামলাটিকে ব্যাপক বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, স্থাপনাটিতে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং গরম পানির সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে এক নারী আহত হয়েছেন বলেও জানান তিনি।

রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার জবাবে ইউক্রেনীয় বাহিনীও বারবার রাশিয়ার তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, শনিবার রাতভর রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের চারটি অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে কয়েক লাখ বাড়িঘর বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, হামলার তীব্রতা ছিল অনেক বেশি। তবে রোববার কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়েছে।

খেরসনের ওলেশকিতে যুদ্ধবিরতি শেষ, বাড়ছে সংঘাতের আশঙ্কা

ইউক্রেনের সতর্কতা অ্যাপে ভুয়া বার্তা ছড়ানোর ঘটনা ঘটেছে দেশটির সম্মুখসারির শহর ওলেশকিতে যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার কয়েক মিনিট আগে। ২০২২ সাল থেকে রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা শহরটিতে ছয় দিনের একটি বিরল যুদ্ধবিরতি কার্যকর ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প ও পোপ চতুর্দশ লিওর সহায়তায় মধ্যস্থতার মাধ্যমে এই যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থা করা হয়। এর ফলে কয়েক শ মানুষ ওলেশকি থেকে নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ পান। রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার ইউক্রেন আক্রমণ শুরুর পর এটিই ছিল সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতি।

তবে যুদ্ধবিরতির সময় নিজেদের সম্মুখসারির সেনাদের শক্তিশালী করার অভিযোগে দুই দেশই একে অপরকে অভিযুক্ত করেছে। ফলে ওলেশকিতে আবারও লড়াই শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তারপরও মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্য উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন ইউক্রেনের কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও পরিকল্পিত সমাধান এবং শান্তি প্রক্রিয়ায় অগ্রগতির পথ তৈরি করতে পারে।

রাশিয়ার পক্ষ থেকে ওলেশকি অভিযান সমন্বয়কারী ইয়ানা লানত্রাতোভা জানিয়েছেন, দুই দেশ নিয়মিত মানবিক সহায়তা কার্যক্রম চালানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। তবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, ক্রেমলিন এসব মানবিক কার্যক্রমকে শান্তি প্রক্রিয়া থেকে আলাদা হিসেবে দেখছে।

সূত্র: বিবিসি

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত