আজ ২৯ অক্টোবর, বিশ্ব স্ট্রোক দিবস। স্ট্রোক সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, এর লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করা এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করার আহ্বান নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছরের আন্তর্জাতিক প্রচারাভিযানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে স্ট্রোকের লক্ষণ চিনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর। প্রচারাভিযানের মূল বার্তা—প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ; চিকিৎসা নিতে দেরি হলে মস্তিষ্কের ক্ষতি বাড়তে পারে।
স্ট্রোক এমন একটি গুরুতর চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থা, যা মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে অথবা মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে ঘটে। এতে মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা না পেলে মৃত্যু, দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অক্ষমতা, কথা বলা ও চলাফেরায় সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২৫ সালের তথ্যপত্র অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বে প্রায় ৯ কোটি ৩৮ লাখ মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর বেঁচে ছিলেন এবং ওই বছর নতুন করে প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। একই বছরে বিশ্বে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল স্ট্রোক। সংস্থাটির হিসাবে, প্রতি চারজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন জীবদ্দশায় স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
বাংলাদেশেও বাড়ছে উদ্বেগ
বাংলাদেশে স্ট্রোকের প্রকৃত রোগী, মৃত্যু ও দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার সংখ্যা নির্ধারণে হালনাগাদ ও নিয়মিত জাতীয় তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে। তবে বিদ্যমান গবেষণাগুলো রোগটির উল্লেখযোগ্য বোঝার ইঙ্গিত দেয়।
২০২২ সালে *ইনিউরোলজিক্যাল সায়েন্সেস* সাময়িকীতে প্রকাশিত দেশব্যাপী জনসংখ্যাভিত্তিক এক গবেষণায় ২৫ হাজার ২৮৭ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতি হাজারে ১১ দশমিক ৩৯ জনের মধ্যে স্ট্রোকের প্রাদুর্ভাব পাওয়া যায়। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ময়মনসিংহে এ হার ছিল সবচেয়ে বেশি—প্রতি হাজারে ১৪ দশমিক ৭১ জন। রাজশাহীতে ছিল সবচেয়ে কম, প্রতি হাজারে ৭ দশমিক ৬২ জন। তবে এগুলো ওই গবেষণার সময়ের ফল; বর্তমান রোগীর সংখ্যা হিসেবে সরাসরি ব্যবহার করা যাবে না।
২০২৪ সালে প্রকাশিত আরেকটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণে বাংলাদেশের ১১টি গবেষণার তথ্য একত্র করে স্ট্রোকের সম্মিলিত প্রাদুর্ভাব ১ দশমিক ১০ শতাংশ পাওয়া যায়। গবেষণাগুলোর সময়কাল, নমুনা ও পদ্ধতির পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন গবেষণার হিসাব এক নাও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস ও রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা ব্যবস্থাপনা, তামাক বর্জন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
স্ট্রোকের লক্ষণ কীভাবে চিনবেন
স্ট্রোকের লক্ষণ অনেক সময় হঠাৎ দেখা দেয়। মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, এক হাত বা পায়ে দুর্বলতা কিংবা অবশ ভাব, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা কথা বুঝতে অসুবিধা—এসব গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। এ ছাড়া হঠাৎ ভারসাম্য হারানো, মাথা ঘোরা বা এক কিংবা দুই চোখে দেখতে সমস্যা হতে পারে।
লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে হবে। রোগীকে নিজে থেকে ওষুধ খাওয়ানো বা ঘরোয়া চিকিৎসায় সময় নষ্ট করা উচিত নয়। কখন লক্ষণ শুরু হয়েছে, সেই সময়টি মনে রাখা চিকিৎসকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। স্ট্রোকের ধরন নির্ধারণে সাধারণত দ্রুত মস্তিষ্কের সিটি স্ক্যান বা এমআরআইসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হয়। রক্তনালিতে জমাট বাঁধার কারণে হওয়া স্ট্রোক এবং রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকের চিকিৎসা এক নয়; তাই চিকিৎসকের মূল্যায়ন ছাড়া চিকিৎসা শুরু করা বিপজ্জনক হতে পারে।
স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে করণীয়
স্ট্রোকের সব ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব না হলেও বেশ কিছু অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা এবং বেশি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণে রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি। ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য পরিহার, খাবারে অতিরিক্ত লবণ কমানো, শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়া এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমও প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রমের লক্ষ্য রাখা উচিত। পাশাপাশি হৃদ্রোগ বা অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দনের মতো সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। আগে স্ট্রোক হয়ে থাকলে পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনও গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসায় দেরি নয়, সচেতনতাই পারে জীবন বাঁচাতে
স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো গেলে উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে সময়সীমার মধ্যে রক্তজমাট ভাঙার চিকিৎসা বা রক্তনালির জমাট অপসারণের মতো পদ্ধতি প্রয়োগ করা সম্ভব হতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা মৃত্যুঝুঁকি ও দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতা কমাতে সাহায্য করে।
বিশ্ব স্ট্রোক দিবসের মূল বার্তাও তাই—স্ট্রোকের লক্ষণ চিনুন, দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিন এবং ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখুন। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং সহজলভ্য জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে স্ট্রোকজনিত মৃত্যু ও অক্ষমতার বোঝা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
পুলিশ নেই এমন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কি পৃথিবীতে আছে?
স্পেনে দ্রুতগতির দুই ট্রেনের সংঘর্ষের পেছনে যে কারণ
ট্রাম্পের সঙ্গে এরদোয়ানের ফোনালাপ, যেসব কথা হলো