বেটিং দমনে কঠোর আইন, থাকছে বৃহৎ শাস্তির বিধান

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৬, ০২:৫৩ পিএম

দেশে অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পরিচালিত জুয়ার বিস্তার রোধে অত্যন্ত কঠোর ও যুগোপযোগী ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন-২০২৬’ কার্যকর করেছে সরকার। এর মাধ্যমে প্রায় ১৫৯ বছর পুরোনো ঔপনিবেশিক আমলের ‘প্রকাশ্য জুয়া আইন ১৮৬৭’ আনুষ্ঠানিকভাবে রহিত করা হলো। 

রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর গত বুধবার (১ জুলাই) আইনটি জারি করে বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশ করা হয়েছে এবং প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই এটি কার্যকর হয়েছে। 

নতুন এই আইনে প্রথমবারের মতো অনলাইন জুয়া, ভিপিএন বা মিরর সাইট ব্যবহার, ম্যাচ ও স্পট ফিক্সিং, ঘোস্ট সিম এবং ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্টের মতো ডিজিটাল অপরাধের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা দিয়ে একে আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য এবং আপোস অযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়াও নতুন এ আইনের আওতায় অপরাধের ধরন অনুযায়ী কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

সাধারণ জুয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ডের নিয়ম থাকলেও অনলাইন জুয়ার ক্ষেত্রে তা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা জরিমানা পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া অনলাইন বেটিং পরিচালনা, বুকমেকার হিসেবে কাজ করা বা ভিপিএন-মিরর সাইট ব্যবহারের অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। 

এছাড়াও ক্রীড়াঙ্গনে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর জেল ও ১ কোটি টাকা জরিমানা এবং স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য পাঁচ বছর জেল ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার পাশাপাশি অপরাধীকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বা স্থায়ীভাবে খেলাধুলা থেকে অযোগ্য ঘোষণার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে আদালতকে। এমনকি গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা কোনো ইনফ্লুয়েন্সার ও শিল্পী যদি জুয়ার বিজ্ঞাপন, প্রচারণা কিংবা স্পন্সরশিপে অংশ নেন, তবে তাদেরও সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা জরিমানা গুণতে হবে।

নতুন আইনে আরও বলা হয়েছে, ভুয়া বা অন্যের এনআইডি-বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার করে তৈরি ‘ঘোস্ট সিম’ বা ভুয়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে জুয়া চালালে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড হবে। তবে এই অপরাধ যদি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে কিংবা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে শাস্তি বেড়ে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা হবে। জুয়ার অর্থ লেনদেনকে ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২’-এর সম্পৃক্ত অপরাধ (পেডিকেট ওফেন্স) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অপরাধে ব্যবহৃত বা অপরাধলব্ধ ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ক্রিপ্টো সম্পদ, ডোমেইন, সিম, ডিভাইস এবং জুয়া খেলার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত ভবন বা কল সেন্টার আদালতের আদেশে বাজেয়াপ্ত করা যাবে। কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠান বা পেমেন্ট গেটওয়ে জড়িত থাকলে এর কর্মকর্তাদের দায়ী করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বা কার্যক্রম বাতিল করা যাবে।

অনলাইন ও সাইবার স্পেসের মাধ্যমে সংঘটিত এই অপরাধগুলোর বিচার হবে সাইবার ট্রাইব্যুনালে, যা সাব-ইন্সপেক্টরের নিচে নন এমন পুলিশ কর্মকর্তা তদন্ত করবেন। তদন্তের স্বার্থে আদালতের অনুমতি নিয়ে অভিযুক্তের ব্যাংক বা ক্রিপ্টো ওয়ালেট সাময়িকভাবে ফ্রিজ (স্থগিত) করা যাবে। আইন বাস্তবায়নে সরকারকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিপ প্যাকেট ইনস্পেকশন (ডিপিআই) এবং ট্রানজ্যাকশন মনিটরিং সিস্টেমের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে একটি জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট ডেটাবেজ এবং এনআইডি-সিম-এমএফএস লিংকিং সিস্টেম চালুর সুযোগ রাখা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএফআইইউ এবং জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সিসহ বিভিন্ন সংস্থা সমন্বিতভাবে এই আইন বাস্তবায়নে কাজ করবে।

SN
আরও পড়ুন