জার্মানির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেল নেটওয়ার্ক, জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো সম্ভাব্য নাশকতার লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে সামরিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর আশপাশে সন্দেহজনক ড্রোন উড়তে দেখা যাওয়ার ঘটনাও বেড়েছে।
জার্মান সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে অভ্যন্তরীণ একটি সরকারি নথির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের শুরু থেকে দেশটির ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ অফিস (BKA) ১৬০টি সম্ভাব্য নাশকতার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। একই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও অন্যান্য সংবেদনশীল স্থাপনার আশপাশে ৭০০টির বেশি সন্দেহজনক ড্রোন দেখার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
এসব ঘটনার মধ্যে বিদ্যুৎ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ব্র্যান্ডেনবুর্গে একটি বিদ্যুৎ সাবস্টেশনের কাছে রকেটসদৃশ বিস্ফোরক যন্ত্র পাওয়া যায়। একটি যন্ত্র বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাতে সক্ষম হয়। পরে কোলনের কাছে বার্গহাইমের একটি সাবস্টেশনে ইচ্ছাকৃতভাবে শর্ট সার্কিট ঘটানো হয়। এতে ৪,২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার পাঁচটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ ইউনিট সাময়িকভাবে গ্রিডের বাইরে চলে যায়।
তবে এসব ঘটনার সবগুলোর পেছনে একই ব্যক্তি বা সংগঠন রয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। জার্মান কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য বিদেশি রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা, বামপন্থী উগ্রবাদ এবং অন্যান্য সম্ভাবনাও তদন্ত করছে। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় রাশিয়ার সম্ভাব্য হাইব্রিড কর্মকাণ্ড নিয়ে জার্মান সরকারের উদ্বেগ রয়েছে। তবে মস্কো জার্মানির এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সব অবকাঠামো পাহারা দেওয়া কঠিন
জার্মানির মতো একটি বড় শিল্পোন্নত দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর পরিমাণ এত বেশি যে প্রতিটি স্থাপনায় একই মাত্রার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন। বিদ্যুৎ সরবরাহের সাবস্টেশন থেকে রেললাইন, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা, বিমানবন্দর, বন্দর এবং প্রতিরক্ষা শিল্প—সবকিছুকে একসঙ্গে সার্বক্ষণিক পাহারা দেওয়া প্রায় অসম্ভব।
এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই ছোট পরিসরের নাশকতাও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ গ্রিডের গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংযোগস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন, যোগাযোগ ও অন্যান্য জরুরি সেবায় প্রভাব পড়তে পারে।
জার্মানির সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও সেই ঝুঁকি স্পষ্ট করেছে। বার্গহাইমের ঘটনায় পুরো জাতীয় গ্রিড অচল না হলেও একসঙ্গে কয়েকটি বিদ্যুৎ ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। বিকল্প ব্যবস্থার কারণে বড় ধরনের ব্ল্যাকআউট এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
ড্রোন নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ
নাশকতার পাশাপাশি সন্দেহজনক ড্রোন চলাচলও জার্মানির নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। সামরিক ঘাঁটি, বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর ড্রোনের উপস্থিতি সম্ভাব্য নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ কিংবা হামলার প্রস্তুতির আশঙ্কা তৈরি করছে।
আগস্টে লাইপজিগ/হালে বিমানবন্দর এলাকায় বিস্ফোরক বহনকারী ড্রোন হামলার চেষ্টার ঘটনায় জার্মানি রাশিয়াকে দায়ী করেছে। বার্লিনের দাবি, ঘটনাটি বৃহত্তর রুশ ‘হাইব্রিড যুদ্ধের’ অংশ। রাশিয়া অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
জার্মান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্টসহ দেশটির কর্মকর্তারা সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে বিদেশি হস্তক্ষেপ, নাশকতা ও সাইবার হামলার বৃহত্তর হুমকির সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন। একই সঙ্গে সরকার বলছে, কিছু হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হওয়ায় বিদ্যমান নিরাপত্তাব্যবস্থাও কার্যকর হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ১৬০টি সম্ভাব্য নাশকতা ও ৭০০টির বেশি সন্দেহজনক ড্রোন দেখার ঘটনা জার্মানির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। এসব সংখ্যা থেকে প্রতিটি ঘটনাই যে প্রকৃত নাশকতা বা বিদেশি হামলা ছিল, তা বলা যায় না। তবে ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা দেখাচ্ছে, ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এখন শুধু প্রচলিত অপরাধ নয়, বরং নাশকতা, সাইবার হামলা ও সম্ভাব্য হাইব্রিড যুদ্ধের ঝুঁকির মধ্যেও রয়েছে।
যে কারণে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা থেকে সোনা সরাচ্ছে ইউরোপীয় দেশগুলো
মালয়েশিয়ার সারাওয়াকে ভয়াবহ বায়ুদূষণ, জরুরি অবস্থা জারি